মাটির অবক্ষয়জনিত মতবাদ Soil Exhaustation Theory

মাটির অবক্ষয়জনিত মতবাদ ভৌগোলিক অবস্থান বা জলবায়ু অনুমিতি তত্ত্বের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। এ তত্ত্বের প্রবক্তারা দাবি করেন যে, পৃথিবীর প্রাচীন ও বর্তমান সময়ের বড় বড় সাম্রাজ্য বা সভ্যতার পতনকে এ তত্ত্বের আলোকে চিহ্নিত করা যায়। এ তত্ত্বের বিশ্বাসী পণ্ডিতদের মতে, মানব সমাজ কর্তৃক ধ্বংস প্রাপ্ত হয়নি এমন যেকোনো পরিবেশই উন্নততর সংস্কৃতি বা সভ্যতা গড়ে তুলতে বা পরিপূর্ণ করতে সক্ষম।

তারা আরোও বলেন যে, পৃথিবীর বিস্তীর্ণ মরুভূমি এবং অনুর্বর অঞ্চলসমূহ সৃষ্টি হওয়ার জন্য প্রাকৃতিক নয়, কৃত্রিম কারণই দায়ী। ভূমির অত্যধিক, অপরিকল্পিত, অবহেলিত বা খামখেয়ালিপূর্ণ ব্যবহার এরূপ পরিণতি ডেকে আনে। এমতাবস্থায় ভূমি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন করতে ব্যর্থ হলে সভ্যতাসমূহ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। কিছু বুদ্ধিমান, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, সাহসী এবং ঝুঁকি গ্রহণে সক্ষম মানুষ সুবিধাজনক স্থানে গমন করে। কিন্তু যারা তাদের মূল অবস্থান পরিত্যাগ করে না তারা হতোদ্যম ও নিষ্ক্রিয় হয়ে সমষ্টিগতভাবে দুর্ভাগ্যের শিকার হয় এবং ধ্বংসকে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বলে ধরে নেয়। কিন্তু তারা বুঝতে পারে নি যে, বনভূমির ব্যাপক বৃক্ষ কর্তন, ভূমি থেকে খনি আহরণ ও অত্যধিক গর্ত সৃষ্টি, নিজেদের ও পশুর খাদ্যের জোগাড়ে শিকড়-বাকড়, ধ্বংস করে ফেলা প্রভৃতি ঘটনাগুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য দায়ী।

এরূপ পরিস্থিতিতে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা ও বরফের পর্যায়ক্রমিক আক্রমণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে এবং মাটির উর্বর স্তরের দ্রুত ক্ষয় সাধনের মাধ্যমে উর্বরতার উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকগণ মাটির অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে ৬টি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। যথা-

১. অপরিকল্পিত ভূমির ব্যবহার,

২. ব্যাপক বৃক্ষ নিধন ও বনভূমির ধ্বংস,

৩. ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহার,

8

আবাদি জমিতে গোচারণ ভূমির সৃষ্টি,

৫. মাত্রাতিরিক্ত ভূমির ব্যবহার এবং

৬. চাষাবাদের ভুল পদ্ধতি

অপরিকল্পিত ও যথেচ্ছ ভূমির ব্যবহারের কারণে উপযুক্ত উন্নত সভ্যতাসমূহে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, খাদ্যের উৎপাদন বা যোগান দিয়ে ব্যর্থ হয়। এসব কারণে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ চীন, মেক্সিকো, ইতালির মেসোপটেমিয়া ও প্যালেস্টাইন সভ্যতায় ভূমি ক্ষয়ের কথা উল্লেখ করা যায়। অর্থাৎ নদী ভাঙন, অত্যধিক ভূমিক্ষয় ও ভূমি ধ্বংসের কারণে ভূমির মূলস্তর ঘুরে ঘুরে সাগরের কাছাকাছি পৌঁছায় বা সাগরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। মাটির এই অবক্ষয় রোধ করা যা পূরণ হওয়ার আর কোনো উপায় থাকে না। কেননা মৃত্তিকা বিজ্ঞানের গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল থেকে জানা যায় যে, মৃত্তিকার উপরিভাগের হিউমাস সমৃদ্ধ মাত্র এক ইঞ্চি মাটি তৈরি হতে প্রায় তিনশত বছর অপেক্ষা করতে হয়। মাটির স্তনের অবক্ষয় এতই দ্রুতগতিতে ঘটে যা রোধ করা বা পূরণ হওয়ার কোনো উপায়ই থাকে না। এভাবেই সভ্যতার উৎপত্তি, বিকাশ ও ধ্বংস সাধিত হয়েছে। যেমন- সিন্ধু সভ্যতা।

মাটির অবক্ষয়জনিত মতবাদের সমালোচনা
Criticism of Soil Exhaustation Theory



অনেক মনীষীই মাটির অবক্ষয়জনিত তত্ত্বের সমালোচনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য হলো সভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশ সম্পর্কে কোনো তথ্য এ মতবাদের মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁরা এ তত্ত্বটিকে একটি খণ্ডিত বা আংশিক মতবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পরিশেষে বলা যায় যে, এ সকল স্থানকে কেন্দ্র করে প্রথমে কৃষি কাজ শুরু হয় এবং পরিবর্তীতে তা কোথাও সুবিশাল নগর সভ্যতারও জন্ম দিয়েছিল। আবার মৃত্তিকার ক্ষয়জনিত কারণে বা প্রাকৃতিক কারণে যেখানকার মাটি ফসল উৎপাদনের উপযোগিতা হারায় সেখানকার সভ্যতা ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।