গ্রিক সভ্যতায় দাস প্রথার প্রকৃতি বা স্বরূপ দাস প্রথার গুরুত্ব বা তাৎপর্য Nature, Importance of Slavery in Greek Civilization

যে প্রথা অনুসারে সমাজের ধন-সম্পদশালীদের নিকট দরিদ্র শ্রেণির মনুষত্ব, স্বাধীনতা, বিবেক সম্ভ্রম হিতাহিত জ্ঞান, বিক্রি করে দেওয়া হয় তাকে দাস প্রথা বলে। এ প্রথায় গরীব বা দুর্বল ব্যক্তিকে শক্তিমান ব্যক্তির আদেশ পালনের পাত্র হিসেবে সমাজে অধিষ্ঠিত হয়ে থাকতে হয়। বস্তুত জীবিকা নির্বাহের জন্য নিজের শ্রমকে অন্যের কাছে বিক্রি করাকে দাস প্রথা বলা হয়। যেহেতু দাসরা ছিল প্রভুর সম্পত্তি, তাই নিচের আলোচনায় দাস প্রথার প্রকৃতি বা স্বরূপ উপস্থাপন করা হলো-


প্রাচীন গ্রিসে দাসদের অবস্থা : সব কিছুর উপরে ছিল গ্রিক সমাজে দক্ষতার মূল্য। উৎপাদন ও শ্রমের দ্বারা যেকোনো জাতি উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করতে পারে, তখন গ্রিক অভিজাত ও শাসকগণ তাদের অধীনস্ত দাসদের হত্যা করা বন্ধ করে ছিল মর্মে প্রাচীন গ্রিকগণ মনে করলেন। সমাজের সাথে নিম্ন শ্রেণির লোকদেরকে কাজে লাগিয়ে তাদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক শ্রম আদায় করল। ফলে দাসদের দ্বারা গ্রিক অভিজাত ও শাসকগণ তাদের গৃহকর্মে পশুচারণে, কৃষি কাজে খনিতে কলকারখানায় ধন সম্পদ বৃদ্ধি করতে লাগল ।

গ্রিকরা দাসদেরকে ফসল উৎপাদনের কাজে লাগাত যখন তাদের জমিতে ফসল ফলত। আর ফসল যখন ফলত না, তখন দাসরা অভিজাত ও বণিকদের কাছ থেকে খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্যাদি ধার বা ঋণ নিত। যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে ভূমি চলে যেত। এভাবেই দাসে পরিণত হতো ভূমিহীন কৃষকরা।

২. এথেন্সে দাসদের অবস্থান : সমাজে সবার নিচে ছিল এথেন্স দাসদের অবস্থান। অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের চালিকা শক্তিরূপে ভূমিকা পালন করত দাসরা। অভিজাতদের বিরুদ্ধে কারিগর, ব্যবসায়ী, কৃষক ও বিদেশিরা যৌথ বাহিনীর তীব্র সংগ্রামের ফলশ্রুতি হিসেবে অভিজাতরা পরাজিত হতো।
কৃষকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো পলাতক অভিজাতদের জমি। ফলে কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এ্যাটিকা ও এথেন্সে দাস নিয়োগ করা হতো।

৩. সামাজিক শ্রেণিতে দাস : সর্ব নিম্নস্তরে বা শ্রেণি বিভাগের তৃতীয় স্তরে গ্রিস দাস বা ক্রীতদাসদের অবস্থান ছিল । সামাজিক অবস্থানে দাসরা জীবন্ত হাতিয়াররূপে পরিগণিত হতো। দাসদের নানা নিপীড়নমূলক অত্যাচার ও হত্যার শিকার হতে হতো। দাসদের কোনো প্রকার নাগরিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার ছিল না। এ প্রসঙ্গে হব হাউস উল্লেখ করেছেন যে, দাসরা আইন ও সামাজিক প্রথা হিসেবে অন্যের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হতো ।

৪. শিল্পের প্রসারে দাস প্রথা : বাণিজ্য, কৃষি ও খনিতে কাজের চাপ হ্রাস পেলে শিল্পের কাজে দাসদেরকে নিযুক্ত করা হতো।

এভাবে শিল্পের প্রসারে গ্রিসে দাস প্রথার প্রসার লাভ করে ।

এঙ্গেলস তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, গ্রিসের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে দাসদের ভূমিকার চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি ভূমিকা পালন করেছে শিল্পের প্রসারতায় ।

৫. দাস প্রথার স্বীকৃত রূপ : সামাজিক ভাবেই দাস প্রথা স্বীকৃত ছিল। পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট জীবনযাপন ছিল দাসদের। এ প্রথার স্বীকৃতরূপ প্রসঙ্গে Aristotle উল্লেখ করেছেন যে, সম্পত্তির প্রকরণে দাসরা সজীব সম্পত্তি, অধিকার বর্জিত প্রাণী, অন্যের বিলাসিতার খোরাক ।

৬. খনির কাজে দাস ব্যবহার : খনির কাজে, কৃষির চাইতেও সবচেয়ে বেশি দাসদের নিয়োগ করা হতো। খনিতে দাসদের অমানবিক নির্যাতন করা হতো, দাসরা কোনো কাজে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে। মূলত খনিগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। এখানে নির্ধারিত পরিমাণ কর দিয়ে ইজারা নেয়ার ব্যবস্থা ছিল, খনির কাজ ছিল খুব পরিশ্রমের

৭. কৃষি কাজে দাসদের ব্যবহার : গম, ভুট্টা, জলপাই ইত্যাদি ফসল ফলানো, কর্তন ও সংরক্ষণ কাজে দাসদের ব্যবহার করত, দাস মালিকরা। কৃষি জমিতে সকাল সন্ধ্যা পরিশ্রম করা বাধ্যতামূলক ছিল দাসদের। কৃষি ছাড়াও উদ্যান চাষের প্রচলনের সময়ও দাসদেরকে নিয়োগ করা হতো।

৮. দাস বাণিজ্যের উৎকর্ষ : গ্রিসে সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে বাণিজ্যের চাহিদা প্রসারিত হয় এবং চাহিদা মোতাবে শিল্পের প্রসার ঘটে। তাই দাসদের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়। গ্রিসের বাজারে এথেন্সের দাস ব্যবসায়ীরা নিজেরাও দাস নিয়ে আসত। এভাবে এথেন্স পুরোপুরি দাস রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

৯. ভৌত অবকাঠামো গঠনে প্রাসাদ তৈরি, মন্দির ও রাস্তাঘাট নির্মাণ, পাথরের প্রাচীর গঠন এসব ভারী কাজই দাসর
:
করত। অনেক সময় অন্যদের নিকট দাস ভাড়া দিত, দাস মালিকরা।

১০. গ্রিক সভ্যতার বিকাশ পর্যায়ে দাস : গ্রিক সভ্যতার বিকাশ পর্যায়ে শাসক শ্রেণি কর্তৃক সমাজের অসহায় দুর্বল মানুষ এর তাদের জমি বা দ্রব্যসামগ্রী লুন্ঠন করা হতো এবং সকলের মধ্যে বণ্টন করা হতো অসমভাবে। লুণ্ঠিত লোকজনকে দাসে
পরিণত করা হতো।

গ্রিক সভ্যতায় দাস প্রথার গুরুত্ব বা তাৎপর্য
Importance of Slavery in Greek Civilization

গ্রিসের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলে ছিল দাস প্রথা। তাই দাস প্রথাকে গ্রিসের অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, খনিজ সম্পদ উত্তোলন, নৌ-পরিবহন, প্রভৃতি কাজে দাস প্রথার গুরুত্ব ছিল অপরীসীম। এ ভাবেই দাসরা গ্রিক সভ্যতার প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। দাস প্রথার গুরুত্ব বা তাৎপর্য নিচের আলোচনায় বর্ণন
করা হলো-

১. কৃষি উৎপাদনে দাস প্রথা : প্রাচীন গ্রিসের কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে যে কায়িক শ্রমের প্রয়োজন হতো তা দাসদের মাধ্যমেই মিটানো হতো। দাসরা ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত যাবতীয় কাজ করত। দাস সহজলভ্য হওয় এ সময় দাস শ্রম খুব সস্তা ছিল। গ্রিসে একসময় কৃষির অবনতি হতে থাকে এবং গমের চাষ প্রায় উঠে যায়। উপনিবেশ ও বিদেশ থেকে গম আমদানি করা হয়। ফলে কৃষি উৎপাদনের পরিবর্তে ফলের চাষ এবং উদ্যানই তখন প্রধান স্থান দখল করে নেয়। এসব চাষেও দাস শ্রম নিয়োগ করা হতো।


খনিজ উত্তোলনে দাস : প্রচীন গ্রিসে খনির মালিক ছিল রাষ্ট্র। রাষ্ট্র খনিগুলো নাগরিকদের ইজারা দিত। কিন্তু খনি থেকে আকরিক উত্তোলন করত দাসরা। প্রায় ২০,০০০ দাস খনির কাজে নিয়োজিত ছিল। তাদের একটানা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। তারা যাতে পালাতে না পারে সেজন্য তাদের পায়ে কখনো কখনো শিকল পরিয়ে রাখা হতো। খনিতে কর্মরত দাসের জীবন ছিল অত্যন্ত দুর্বিসহ। কারণ খনির কাজে কোনো যন্ত্রপাতির ব্যবহার ছিল না।

দাসরা উবু হয়ে বসে কিংবা চিৎ হয়ে শুয়ে হাতুড়ি দিয়ে কঠিন আকরিক ধাতু কেটে বের করত। আবার হাতে হাতে এগুলো খনির বাহিরে নিয়ে আসত।

৩. নির্মাণ কাজের জন্য দাস : মন্দির, প্রাসাদ, রাস্তাঘাট, দেব-দেবীর মূর্তি, পাথরের প্রাচীর তোলা প্রভৃতি ভারী নির্মাণ কাজের জন্য দাসদেরকে ব্যবহার করা হতো। আবার অনেক কাজে হঠাৎ করে দাস দরকার পড়লে ভাড়ায় দাস পাওয়া যেত । ৪. শিল্প কারখানায় শ্রমিক : গ্রিসের শিল্পকারখানার আয়তন ছিল ছোট। এগুলো ছিল মূলত কুটির শিল্প। এসব কারখানায় দাসরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। সর্ববৃহৎ কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১২০ জন এবং তারা সবাই ছিল দাস। ছোট কারখানায় মালিক নিজ হাতে কাজ করলেও কঠিন কাজগুলো করাত দাসদের দিয়ে 1

৫. যন্ত্রপাতির পরিবর্তে দাস ব্যবহার : গ্রিকরা উৎপাদনের ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির পরিবর্তে দাস শ্রম ব্যবহার করত। যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে তাদের উৎসাহ ছিল না। কারণ তৎকালীন সমাজে দাস ছিল অত্যন্ত সহজলভ্য এবং তাদের ভরণ পোষণের ব্যয়ও ছিল যৎসামান্য। দাস ভাড়া খাটিয়ে বহু এথেনিয়ান বিত্তবান হয়েছিল। দাস ভাড়া দিয়ে ৩০% মুনাফা হতো। সস্তা অথ পরিশ্রমী দাস ব্যবহার করে ব্যবসায়ীরা সহজে প্রচুর বিত্তবৈভবের মালিক হতে পারত। এছাড়া গ্রিসে ক্রীতদাসের সহজলভ্যতার জন্য বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও প্রয়োজন অনুভূত হয়নি। কারখানায়, খনিজ দ্রব্য উত্তোলনে ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল অনুন্নত ও আদিম ধরনের। ক্রীতদাসের বাহু বলের উপর গ্রিসের উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। দাসদের উৎপাদনের জীবন্ত হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করা হতো।

অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে দাস : এথেন্স ছিল গ্রিসের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এথেন্সের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে দাসদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এ সময় গ্রিসে দাসদের দ্বারাই অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। খ্রিঃপূঃ ৫০০ অব্দে অভিজাতদের বিরুদ্ধে, কৃষক, কারিগর, ব্যবসায়ী ও বিদেশিদের যৌথ বাহিনীর যে তীব্র সংগ্রাম হয় তাতে অভিজাতরা পরাজিত হয়। কেননা এ সংগ্রামে ব্যবসায়ীরা জাহাজের কারিগর, নাবিক, ধীবর প্রমুখকে সংঘবদ্ধ করে। পাইসিস্ট্রোটাস এ বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। খ্রিঃপূঃ ৫০০ অব্দে তিনি গণবাহিনীর সহায়তায় এথেন্স দখল করেন এবং পলাতক অভিজাতদের জমি কৃষকদের মধ্যে ভাগ করে দেন। ফলে ভূমি দাসরা বড় বড় কৃষকদের অধীনে কাজ পায়। খ্রিঃপুঃ ৫০০ অব্দে এথেন্স ও এ্যাটিকায় দাস শ্রমের নিয়োগ উৎপাদনের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। এথেন্স যে নিজেই শুধু দাস খাটাত তা নয়, বরং বড় বড় রাষ্ট্রকে দাস যোগান দিত। তখন এথেন্সই ছিল দাস ব্যবসায়ের প্রধান কেন্দ্র। প্রত্যেক মাসের ১ তারিখে এথেন্সে দাস বেচা কেনার হাট বসতো।

৭. ভৌত অবকাঠামোতে দাস : মন্দির ও প্রাসাদ তৈরি, পাথরের প্রাচীর গঠন, রাস্তাঘাট নির্মাণ ইত্যাদি কাজ মূলত দাসরাই
করত। অনেক সময় দাস মালিকরা অন্যদের নিকট দাস ভাড়া দিত ।

৮. নিচু স্তরের কর্মচারী : তৎকালীন গ্রিসের সরকারি অফিস আদালতে, কেরানি, পিয়ন, দারোয়ান, চাপরাসি, আরদালি প্রমুখ নিচু স্তরের কর্মচারী ছিল দাস। পূর্ত বিভাগের অধীনে অসংখ্য দাস ছিল। দাসরা সরকারি পূর্তকর্ম সম্পাদন করত। এছাড়াও বিভিন্ন শিল্প কারখানায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং মহাজনি কারবারে দাসদের কেরাণী পদে নিয়োগ দেওয়া হতো। এভাবে বিভিন্ন সরকারি কর্মকাণ্ডে দাসরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখত ।

৯. দাস প্রথার স্বীকৃত রূপ : দাসপ্রথা মূলত সামাজিকভাবেই স্বীকৃত ছিল। দাসদের জীবন যাপন ছিল পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট। দাস প্রথার স্বীকৃতরূপ প্রসঙ্গে Aristotle বলেন যে, 'সম্পত্তির প্রকরণে দাসত্ব সজিব সম্পত্তি, অধিকার বর্জিত প্রাণী ও অন্যের বিলাসিতার খোরাক ।

১০. শিল্পের প্রসারে দাস : ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি ও কারখানায় দাসদের কাজের চাপ হ্রাস পেলে আরও অনেক দাস নিযুক্ত
করা হতো। এভাবে শিল্পের প্রসারে গ্রিসে দাস প্রথার প্রসার লাভ করে ।

এঙ্গেলস তার লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, গ্রিসের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে দাসদের ভূমিকার চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি ভূমিকা পালন করেছে শিল্পের প্রসারতায় ।