ব্রত, সংস্কার ও মরণোাত্তর কৃত্য

ব্রত

কোনো বিশেষ মনস্কামনা পূরণের জন্য যে পূজা বা ধর্মানুষ্ঠান করা হয় তার নাম ব্রত। যেমনÑ শিবরাত্রির ব্রত, অক্ষয় তৃতীয়া

ব্রত, দুর্গাষ্টমী ব্রত, মঙ্গলচন্ডী ব্রত ইত্যাদি।

সংস্কার

‘সংস্কার’ কথাটির অনেক প্রকার অর্থ আছে। এখানে যুগাগত প্রথা হিসেবে ধর্মাচার হিসেবে পালনীয় কিছু কৃত্যকে সংস্কার

বলা হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমগ্র জীবনে যে-সকল মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করার শাস্ত্রীয় বিধান আছে সেগুলোকে সংস্কার
বলা হয়।

স্মৃতিশাস্ত্রে দশ প্রকার সংস্কারের উলে খ আছে। সেগুলো হলো: -

১. গর্ভাধান ২. পুংসবন, ৩. সীমন্তোন্নয়ন, ৪. জাতকর্ম

৫. নামকরণ, ৬. অন্নপ্রাশন ৭. চূড়াকরণ ৮. উপনয়ন

৯. সমাবর্তন, ১০. বিবাহ

সবগুলো সংস্কার ভিত্তিক অনুষ্ঠান এখন আর সচরাচর করা হয় না। নিচে প্রধান প্রধান ও প্রচলিত সংস্কার গুলোর পরিচয়
দিচ্ছি :

জাতকর্ম

জাতকর্ম সংস্কারে সন্তানের জন্মের পর পিতা যব, যষ্টি মধু ও ঘৃত দ্বারা সন্তানের জিহŸা স্পর্শ করে মন্ত্রোচ্চারণ করেন।

নামকরণ

সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর দশম, একাদশ, দ্বাদশ বা শততম দিবসে তার নামকরণ করতে হয়।

অন্নপ্রাশন

পুত্রের জন্মের ষষ্ঠ মাসে এবং কন্যার জন্মের পঞ্চম, অষ্টম বা দশম মাসে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করে প্রথম অন্নভোজন করানোর

নাম অন্নপ্রাশন।

বিবাহ

যৌবনে দেব ও পিতৃপূজা, হোম প্রভৃতির মাধ্যমে মন্ত্রোচ্চারণ করে বর ও বধূর মিলন রূপ সংস্কারকে বিবাহ বলে।

সনাতন ধর্ম অনুসারে বিবাহের কতকগুলো বিধি-বিধান শাস্ত্রীয়, কতকগুলো লৌকিক ও স্ত্রী আচার। বিবাহ স্বামী ও স্ত্রীর

মধ্যে পবিত্র বন্ধন যাপন করে। বিবাহের দ্বারা দুটি নর-নারীর জীবন এক সূত্রে বাঁধা পড়ে। একজন হয় আরেক জনের সুখ-

দুঃখের সাথী। বিবাহ হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের বন্ধন স্থাপনের পবিত্র ও বৈধ উপায়। তাই তো বিবাহে উচ্চারিত একটি মন্ত্র:

যদেতৎ হৃদয়ং তব

তদস্তু হৃদয়ং মম।

যদিদং হৃদয়ং মম

তদস্তু হৃদয়ং তব।

অর্থাৎ তোমার হৃদয় আমার হোক,

আমার হৃদয় হোক তোমার।

মরণোত্তর কৃত্য

জন্ম গ্রহণ করলে মৃত্যু হবেই। তাই কেউ মারা গেলে মরণোত্তর কৃত্য পালন করা হয়। সনাতন ধর্ম অনুসারে মরণোত্তর

কৃত্যের মধ্যে রয়েছে :

ক. অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া

খ. অশৌচ পালন

গ. শ্রাদ্ধানুষ্ঠান

ক. অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া

দেহ থেকে আত্মা অন্তর্হিত হলে দেহ একটি অচল পদার্থে পরিণত হয়। ক্রমে ক্রমে এটি পচে যায়। তাই শাস্ত্রে মৃতদেহ

সৎকারের বিধান দেওয়া হয়েছে। এ সৎকারই অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া নামে পরিচিত।

সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মৃতদেহকে অগ্নিতে দাহ করেন। বিশেষ ক্ষেত্রে মুখাগ্নি করার পর সমাধিস্থ করা হয়। তবে তা বিরল।

মৃতদেহ দাহ করাই বহুল প্রচলিত প্রথা। দাহ করার সময় সনাতন ধর্মের বিধান অনুযায়ী মন্ত্র ও পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

অশৌচ পালন

‘অশৌচ’ বলতে বোঝায় শুচিতার অভাব। মাতা-পিতা বা জ্ঞাতিদের কেউ মারা গেলে আমরা শোকে আকুল হই। আমাদের

মন সাধন-ভজনের উপযোগী থাকে না। তখন আমরা অশুচি হই।

এ অবস্থা কাটতে সময় লাগে। তাই সনাতন ধর্ম অনুসারে অশৌচ পালন করতে হয়। বর্ণ অনুসারে অশৌচ পালনের দিবস

সংখ্যায় তারতম্য দেখা যায়। এটা একালে বাঞ্ছনীয় নয় বলেই মনে করি। সকল বর্ণের অশৌচ পালনের দিবস সংখ্যা সমান
হওয়া যুক্তিসঙ্গত ও বাঞ্ছনীয়।

শ্রাদ্ধানুষ্ঠান

‘শ্রদ্ধা’ শব্দটি থেকে শ্রাদ্ধ শব্দটি এসেছে। অশৌচ কাল শেষ হলে তার পরের দিন শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করণীয়। মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে

শ্রদ্ধা জানিয়ে দান করা হয় এবং ভোজের ব্যবস্থা করা হয়।

পাঠসংক্ষেপ

কোনো বিশেষ মনস্কামনা পূরণের জন্য যে পূজা বা ধর্মানুষ্ঠান করা হয়, তার নাম ব্রত। যেমনÑ শিবরাত্রিব্রত, জন্মাষ্টমী ব্রত

ইত্যাদি। যুগাগত প্রথানুসারে ধর্মাচারসমূহকে সংস্কার বলে। সংস্কার দশ প্রকার। কেউ মারা গেলে সনাতন ধর্মানুসারে তার

মৃহদেহ সাধারণত দাহ করা হয়, তারপর অশৌচ পালন করা হয় এবং সর্বশেষে শ্রাদ্ধ করা হয়। মৃত্যুর পরেকার এ
কৃত্যসমূহকে বলা হয় মরণোত্তর কৃত্য।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন: ১৬.৭

সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন:

১. বিশেষ মনস্কামনা পূরণের জন্য যে পূজা বা ধর্মানুষ্ঠান করা হয় তাকে কী বলে?

ক. নিত্যকর্ম খ. ব্রত গ. পার্বণ ঘ. নৈমিত্তিক কর্ম

২. সনাতন ধর্মানুসারে প্রধান সংস্কার কয়টি?

ক. পাঁচটি খ. আটটি গ. দশটি ঘ. বারোটি

৩. সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার ঠিক পরেকার সংস্কারটি কী?

ক. নামকরণ খ. জাতকর্ম গ. অন্নপ্রাশন ঘ. হাতে খড়ি

সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন

১. ব্রত কাকে বলে?

২. সংস্কার বলতে কী বোঝেন?

৩. সংস্কার কয়টি ও কী কী?

রচনামূলক প্রশ্ন

১. ব্রত বলতে কী বোঝায়? দৃষ্টান্তসহ বুঝিয়ে লিখুন।

২. ব্রত পালনের উদ্দেশ্য কী? বুঝিয়ে লিখুন।

৩. সংস্কার কাকে বলে? বিবাহ সংস্কারের পরিচয় দিন।