নৃবিজ্ঞানীরা ব্যান্ড সমাজের কী বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করেছেন?
মুখিয়াতন্ত্র বা চীফডম বলতে নৃবিজ্ঞানীরা কী বুঝিয়েছেন?


রাষ্ট্রবিহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার নমুনা নৃবিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন ইউরোপের বাইরে। আগের পাঠ
থেকে আপনারা জানেন যে বিভিন্ন উপনিবেশে নৃবিজ্ঞানীগণ গবেষণা করেছেন গত শতকের শেষভাগ
থেকে। আর রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করা হয় এই শতকের মাঝামাঝি। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের পর যখন বিভিন্ন দেশে ইউরোপের মত রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটছে তখনও নানান অঞ্চলে অন্যান্য
ধরনের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও প্রক্রিয়া চালু ছিল। ফলে নৃবিজ্ঞানীরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও মাঠ
গবেষণায় সেইসব নমুনা দেখতে পেয়েছেন। সেই সব রাজনৈতিক ব্যবস্থার বর্ণনাই রাজনৈতিক
নৃবিজ্ঞানের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে দেখা দিয়েছিল Ñ তা আপনারা এর মধ্যেই জানেন। এখানে দুটো ব্যাপার
লক্ষ্য রাখলে আমাদের পক্ষে বিষয়টাকে বোঝা সহজ হবে। প্রথমত, নৃবিজ্ঞানীদের অভিজ্ঞতায়
রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলতে আধুনিক কালের রাষ্ট্র ব্যবস্থাই ছিল। দ্বিতীয়ত, যে সমাজই হোক না কেন
রাজনৈতিক ব্যবস্থা সেখানে স্থির কিছু নয়। অর্থাৎ, ঔপনিবেশিক শক্তির প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ চাপে যে
কোন অঞ্চলে এবং যে কোন জাতিতে নিজস্ব রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বদল ঘটছিল। সুতরাং নৃবিজ্ঞানীরা
একটা বদলমান পরিস্থিতির স্বাক্ষী ছিলেন তাঁদের গবেষণার সময়ে। এটা আমাদের লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন
এই কারণে যে অধিকাংশ নৃবিজ্ঞানীদের কাজেই এই পরিস্থিতি নিয়ে কোন ব্যাখ্যা নেই। আগেই বলেছি,
রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলতে কিছু নৃবিজ্ঞানী বুঝিয়েছেন কোন সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সমাজের
সদস্যদের দ্বারা সামাজিক নিয়ম পালন করানো, এবং কারো কারো ব্যাখ্যায় সম্পদের বণ্টন প্রক্রিয়া
তদারকি করার একটা ব্যবস্থা। কোন কোন নৃবিজ্ঞানী বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে চার
সংগঠনে ভাগ করেছেন। ব্যান্ড রাজনৈতিক সংগঠন, “ট্রাইব” বা “উপজাতীয়” রাজনৈতিক সংগঠন,
চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্র এবং রাষ্ট্র।
ব্যান্ড সমাজ
নৃবিজ্ঞানী যাঁরা তথাকথিত ‘সরল সমাজে’র বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করেছেন তাঁদের অনেকের মতেই ব্যান্ড
সমাজের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সবচেয়ে সরল ধরনের। ধারণা করা হয়ে থাকে যে শিকারী-সংগ্রহকারী
সমাজেই এই ধরনের ব্যবস্থা চালু থাকে। আর তাদের প্রধান আর্থনীতিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পারস্পরিক
লেনদেন। ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তির ধারণা কিংবা চর্চা এসব সমাজে নৃবিজ্ঞানীরা দেখতে পাননি।
বিশেষ করে পানি, জমি এই ধরনের সম্পদের বেলায় শরীকী ব্যবহারের প্রচলন থাকে। সম্পদ, সম্মানআত্তি এবং ক্ষমতার ভেদাভেদে সমাজের মানুষজনের মধ্যে তেমন ফারাক নেই। এই আলোচনার
শুরুতেই ব্যান্ড বলতে কি বোঝানো হয়ে থাকে তা বলা যায়। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, ব্যান্ড হচ্ছে কিছু
মানুষের একটা দল যাঁরা সম্পর্কে পরস্পর খুবই কাছাকাছি, একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করেন এবং
রাজনৈতিকভাবে সার্বভৌম।
ব্যান্ড সমাজে সাধারণ মানুষজন কিংবা স¤প্রদায় একটা রাজনৈতিক একক হিসেবে কাজ করে থাকেন।
এর মানে হ’ল এই ধরনের সমাজে স¤প্রদায় বা গোষ্ঠীই হচ্ছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক একক। এর
ব্যান্ড হচ্ছে কিছু মানুষের একটা
দল যাঁরা সম্পর্কে পরস্পর খুবই
কাছাকাছি, একটা নির্দিষ্ট
অঞ্চলে বসবাস করেন এবং
রাজনৈতিকভাবে সার্বভৌম।
বাইরে বৃহত্তর অন্য কোন রাজনৈতিক সংগঠনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। নৃবিজ্ঞানীদের বড় একটা
অংশই মনে করেন যে খাদ্য সংগ্রহকারী প্রত্যেক সমাজেরই বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই ধরনের রাজনৈতিক
ব্যবস্থা। কৃষি আবিষ্কৃত হবার আগে, অর্থাৎ ১০,০০০ বছর আগে প্রায় সকল সমাজেরই এই ধরনের
রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল বলে তাঁদের অভিমত। এই দলগুলো খুব বেশি বড় মাপের নয় আর জনসংখ্যার
ঘনত্ব তেমন নয়। এক একটা ব্যান্ড দলে ২০ থেকে ৫০ জনের মত সদস্যের কথা উলে- খ পাওয়া
যায়। আর এক একটা অঞ্চলে ৫ থেকে ৫০ বর্গ মাইল এলাকায় একজনের বাস। তবে যে সময়ে
নৃবিজ্ঞানীরা এই সব সমাজ নিয়ে গবেষণা করছেন সেই সময়ে এইসব সমাজের মানুষজনের অনেকেই
ইউরোপ থেকে বয়ে আনা রোগের শিকার হয়ে মারা পড়েছেন। ফলে এদের জনসংখ্যার হিসাব একটা
গোলমেলে ব্যাপার।

আধুনিক সমাজের নেতৃত্ব দিয়ে ব্যান্ড সমাজের নেতৃত্বকে বোঝা যাবে না। কোন ধরনের আনুষ্ঠানিক
নেতৃত্ব এই ধরনের ব্যবস্থায় নেই। নেতা বলতে যাঁরা শিকারে দক্ষ, বিচক্ষণ এবং বয়সে বড় তাঁরাই।
আপনারা ইতোমধ্যেই জানেন বয়স একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অ-ইউরোপীয় সমাজে। বিচক্ষণতা, দক্ষতা
এবং সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান বিষয়ে জ্ঞান থাকার মধ্য দিয়ে একজন প্রবীণ অন্যদের সম্মান অর্জন
করে থাকেন। এভাবে নির্বাচিত নেতা বা প্রধান কোনমতেই কারো উপর তাঁর মতামত এবং ভাবনা-চিন্তা
চাপাতে পারেন না। সিদ্ধান্তনেবার প্রক্রিয়া হ’ল: ব্যান্ডের সকল প্রবীণ মানুষজন একত্রে আলাপআলোচনা করেন। নেতা বড়জোর তা পরিচালনা করেন এবং সিদ্ধান্তবাস্তবায়নে তৎপরতা দেখান।
অনেক সমাজেই নিজস্ব ভাষায় এই রকম নেতাকে সম্বোধন করা হয়ে থাকে ‘মুরুব্বী’ বা ‘জ্ঞানী’ বলে।
সমাজে যাঁরা অন্য কোন উপায়ে সম্পদ সংগ্রহ করে সেগুলো অন্যদের মাঝে বিলি বণ্টন করেননি,
তাঁদেরকে ঠিক ‘ধনী’ বলা হয় না। আর তা বলা হলেও তার সাথে নেতার বিরাট পার্থক্য আছে।
নেতৃত্বকে ঠিক ক্ষমতার আধার হিসেবে বলা যায় না। বরং নেতার কাজ হচ্ছে প্রভাবিত করা।
এস্কিমোদের প্রত্যেক দলের মধ্যে এরকম প্রধান ছিলেন। সেই সব প্রধানকে অন্যরা মানতেন তাঁর
দক্ষতা এবং সুবিচার করার মন মানসিকতাকে স্বীকৃতি দিয়ে। প্রধানের নানাবিধ পরামর্শ দলের সদস্যরা
মেনে চলতেন। এর মানে এই নয় যে তাঁর কোন স্থায়ী ক্ষমতা ছিল কিংবা চাইলেই তিনি কারো ওপর
নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারতেন। এস্কিমোদের মধ্যে এই নেতা বা প্রধানেরা সকলে পুরুষই ছিলেন।
তবে তাঁরা নারীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন বিভিন্ন বিষয়ে (জিন এল ব্রিগ্স ১৯৭৪)। যে কোনভাবেই
চিন্তা করি না কেন, নেতৃত্বের অর্থের একটা সীমারেখা ছিল।
ব্যান্ড সমাজের মধ্যে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য, কাউকে শাস্তিদেবার জন্য শিথিল কতগুলো
নীতিমালা থাকে। যেমন একত্রে নিন্দা করা, তিরস্কার করা কিংবা এড়িয়ে চলা। খুব বড় কোন ক্ষেত্রে
কাউকে হত্যা করা বা সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেয়া ঘটতে পারে। সমাজের মানুষের মধ্যে কাউকে
ঠকানোর কোন প্রবণতা লক্ষ্য করতে পারেননি নৃবিজ্ঞানীরা। এক্ষেত্রে একটা উদাহরণ দেয়া যেতে
পারে। আফ্রিকার কালাহারি এলাকার কুং!-দের মধ্যে মাংস ভাগ না করে খাওয়ার কথা কেউ ভাবতেই
পারে না। নৃবিজ্ঞানী মার্শাল যখন কুং!-দের মধ্যে কাজ করছিলেন, তিনি কাউকে পরামর্শ দিয়েছিলেন
যে যদি কেউ কাউকে না জানিয়ে পরিবারের জন্য মাংস সরিয়ে রাখতে পারেন তাহলে তো আর অন্যকে
ভাগ দিতে হয় না। শুনে তাঁরা খুবই হেসেছেন। কুং!-দের কাছে এটা খুবই খারাপ একটা ব্যাপার।
তাহলে তো মানুষ সিংহের মত হিংস্র হয়ে গেল। সমাজের অন্যরাও তখন তাকে সিংহের মত সমাজ
থেকে দূরে তাড়িয়ে দেবে। তাকে শিক্ষা দেবার জন্য এক টুকরো মাংসও খেতে দেয়া হবে না। চুরি
করাও কুং!-দের মধ্যে জঘন্য ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। খুব কমই এসব ঘটে। তবু
কেউ চুরির মত কোন অপরাধ করলে তার মুখের উপর কারো পায়ের ছাপ এঁকে দেয়া হয়, যাতে
সকলেই চিনে যেতে পারে। চুরি কিংবা খাদ্য ভাগ করার অপরাধকে সব ব্যান্ড সমাজেই বিরাট করে
দেখা হয়ে থাকে। তবে কুং! জাতি এই সকল ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখার সবচেয়ে ভাল উদাহরণ
এস্কিমোদের প্রত্যেক দলের
মধ্যে এরকম প্রধান ছিলেন।
সেই সব প্রধানকে অন্যরা
মানতেন তাঁর দক্ষতা এবং
সুবিচার করার মন
মানসিকতাকে স্বীকৃতি দিয়ে।
ব্যান্ড সমাজের মানুষের মধ্যে
কাউকে ঠকানোর কোন
প্রবণতা লক্ষ্য করতে পারেননি
নৃবিজ্ঞানীরা। ... আফ্রিকার কুং!
#NAME?
খাওয়ার কথা কেউ ভাবতেই
পারে না। নৃবিজ্ঞানী মার্শাল
যখন কুং! দের মধ্যে কাজ
করছিলেন, তিনি কাউকে
পরামর্শ দিয়েছিলেন ...
পরিবারের জন্য মাংস সরিয়ে
রাখতে ... শুনে তারা খুবই
হেসেছিল। কুং! দের কাছে এটা
খুবই খারাপ একটা ব্যাপার।
তাহলে তো মানুষ সিংহের
মতো হিংস্র হয়ে গেল।
সমাজের অন্যরাও তখন
তাকে শিংহের মতো সমাজ
থেকে দূরে তাড়িয়ে দিবে।
হিসেবে স্বীকৃত। কোন কোন ব্যান্ড সমাজের মধ্যে চুরির কিংবা ভাগ না দেবার প্রবণতা নৃবিজ্ঞানীরা লক্ষ্য
করেছেন। যেমন: বলিভিয়ার আমাজন বেসিনের সিরিওনো জাতি। তবে এই সমস্তক্ষেত্রে খাদ্যের সংকট
এবং দুর্ভিক্ষ একটা প্রধান কারণ বলে ধরে নেয়া হয়। ইনুইত-দের কেউ সামাজিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য
করলে কোন ওঝা তাকে স্বীকারোক্তি দিতে বলে, কিংবা অপরাধ আরো গুরুতর বলে বিবেচিত হলে
তাকে সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হতে পারে।
ব্যান্ড সমাজে আনুষ্ঠানিকভাবে সংঘর্ষ চালাবার জন্য কোন সামরিক বাহিনী নেই। এমনকি দল বেঁধে
তেমন বড় মাপের কোন দ্ব›দ্ব-সংঘাতও ঘটে থাকে না। ব্যক্তিগত পর্যায়ে কারো সাথে কারো লড়াই
ঝগড়া হতে পারে। কিংবা পারিবারিকভাবে দীর্ঘকাল ফ্যাসাদ লেগে থাকতে পারে। এই সমস্তক্ষেত্রে খুন
জখমের মত ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছেন নৃবিজ্ঞানীরা। তবে সমাজের মধ্যেই সেগুলো নিষ্পত্তি ঘটিয়ে
ফেলতে সক্ষম তারা। সাধারণত নেতা বা প্রধানরা একত্রে নিয়ে বসেন উভয় পক্ষকে। এ ছাড়া কিছু
ক্ষেত্রে মুষ্টিযুদ্ধ বা গানের লড়াইয়ের মাধ্যমে ঝগড়া মেটানোর ঘটনা দেখেছেন নৃবিজ্ঞানীরা। তা হচ্ছে:
যখন কোন লোকের সঙ্গে কারো ঝগড়া বেধেছে এবং প্রতিহিংসা কাজ করছে, তখন উভয়কে সম্মত
করানো হয় যাতে তারা একত্রে গানের লড়াইয়ে বা মুষ্টিযুদ্ধে সামিল হয়। গানের ক্ষেত্রে নিজস্ব সুরের
সাথে তীক্ষè কথা জুড়ে উভয়ে উভয়ের সঙ্গে তর্ক বাধায়। যার দিকে তালি বেশি পড়ে সেই জয়ী Ñ এই
পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি হয়। এতে করে ঝগড়ার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান হয় এবং শত্রæতা কমে। এরকম
নজির পাওয়া গেছে ইনুইত-দের মাঝে।
“ট্রাইব” বা “উপজাতীয়” সমাজ
ব্যান্ড সমাজের সঙ্গে এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমাজের পার্থক্যের মূল জায়গা হ’ল: এখানে
সমাজের মধ্যে কতগুলো সংঘ কাজ করে। অর্থাৎ, ব্যান্ড সমাজে যেমন ব্যান্ডই হচ্ছে রাজনৈতিক
ব্যবস্থার একক, এখানে সদস্যদের নানাবিধ সার্বভৌম সংঘ থাকে আর সেই সংঘগুলোর নানাবিধ
রাজনৈতিক দায়িত্ব বা ভূমিকা থাকে। “উপজাতীয়” রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেই সংঘগুলো রাজনৈতিক
একক হিসেবে কাজ করে। আবার সেই সংঘগুলোর সমন্বয়ে খোদ ট্রাইবটির রাজনৈতিক কার্যাবলী চলে।
সেই হিসেবে এই রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বহুস্থানীয় রাজনৈতিক সংহতি বলা যেতে পারে। তবে সেই
সংহতিকে স্থায়ী বলা যায় না। বরং কোন সমস্যা বা বহিঃ আক্রমণের কালে এই সংহতি কাজ করে। এই
সংঘগুলোর মধ্যে যোগাযোগ থাকে সমস্যাটা যতদিন আছে ততদিনই। তারপর নিজ সার্বভৌম এলাকায়
সংঘগুলো আবার ফিরে যায়।
নৃবিজ্ঞানীরা ট্রাইব বলতে বুঝিয়েছেন কতকগুলি ব্যান্ডের সমন্বয় যেখানকার সদস্যরা একই ভাষায় কথা
বলে, একই সংস্কৃতি তাদের এবং একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করে। বাংলাদেশে অধিকাংশ নৃবিজ্ঞানী
ট্রাইবের পরিভাষা হিসেবে ‘উপজাতি’ বলে থাকেন। এটা সরকারেরও ভাষ্য। ইংরেজি ‘ট্রাইব’ কিংবা
বাংলা ‘উপজাতি’ Ñ দুই শব্দেরই রাজনৈতিক সমালোচনা আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত
উপজাতি নিয়ে রাষ্ট্রের ব্যাখ্য এবং আচরণ এই সমালোচনার কারণ। তাছাড়া নৃবিজ্ঞানীদের অনেকেই
রাষ্ট্রের এবং শক্তিশালী জাতির দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন বলে সেটাও সমালোচনার কারণ হয়েছে।
ট্রাইবের সদস্য সংখ্যা ব্যান্ড-এর তুলনায় অনেক বেশি। কতকগুলির আকার বেশ বড়। আফ্রিকার
টিভদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৮০,০০০। আবার নুয়েরদের সংখ্যা ইভান্স প্রিচার্ডের গবেষণার সময়কালে
প্রায় ২ লক্ষাধিক ছিল। অধিকাংশ নৃবিজ্ঞানী মনে করেন ক্ষুদ্র-জাতি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমাজ মূলত
পশুপালন এবং চাষবাষ কেন্দ্রিক। এখানে জনসংখ্যার ঘনত্বও ব্যান্ড-এর তুলনায় বেশি।
ব্যান্ড সমাজের মত এখানেও জ্ঞাতিসম্পর্কের ভূমিকা খুবই ব্যাপক। নৃবিজ্ঞানীরা ট্রাইব সমাজের
রাজনৈতিক চালিকা শক্তির মূল কেন্দ্র মনে করেছেন জ্ঞাতিসম্পর্ককে। আগেই উলে- খ করা হয়েছে
যে, এর সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: এখানে নানাবিধ সংঘ রাজনৈতিক একক হিসেবে কাজ করে।
“উপজাতীয়“ রাজনৈতিক
ব্যবস্থায় কতকগুলো সংঘ
রাজনৈতিক একক হিসেবে কাজ
করে। আবার সেই সংঘগুলোর
সমন্বয়ে খোদ “উপজাতী“ টির
রাজনৈতিক কার্যাবলী চলে।
সেই হিসেবে “উপজাতী“
রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বহুস্থানীয়
রাজনৈতিক সংহতি বলা যেতে
পারে।
ট্রাইব বা “উপজাতি” মধ্যকার এইসব সংঘের মূল ভিত্তি হচ্ছে জ্ঞাতিসম্পর্ক। গোত্র (ক্লান) হচ্ছে এ
ধরনের সংঘের একটা ধরন। আরেকটি ধরন হচ্ছে খন্ডিত গোষ্ঠী সংগঠন (সেগমেন্টারি লিনিয়েজ
সিস্টেম)। রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালিত হবার ক্ষেত্রে এই দুই সংঘের ব্যাপক গুরুত্ব। এ ছাড়াও
সমবয়সীদের দল (এজ সেট) খুবই তৎপর বলে মনে করেছেন নৃবিজ্ঞানীরা। বিশেষভাবে পূর্ব
ইউরোপের “উপজাতি” সমূহের (ট্রাইব) মধ্যে এর কাজ আলাদা করে ধরা পড়ে। সমবয়সী-দলের কাজ
হচ্ছে জাতির বিভিন্ন স্থানীয় অংশসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করা, সমন্বয় করা। বিশেষ করে কোন বহিঃজাতির
আক্রমণের সময়ে। তবে নৃবিজ্ঞানীরা এর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন বিভাজিত গোষ্ঠী
ব্যবস্থাকে। নৃবিজ্ঞানী মার্শাল সাহলিন্স (১৯৬১) এবং তারও আগে ইভান্স প্রিচার্ড (১৯৪০) আফ্রিকার
টিভ এবং নুয়ের সমাজের উপর এ নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন।
খন্ডিত গোষ্ঠী সংগঠন হচ্ছে গোত্রের মধ্যকার আরও ক্ষুদ্রতর বিভাজন। যেমন: নুয়েরদের মধ্যে মোটামুটি
২০ টির মত গোত্র খুঁজে পাওয়া গেছিল। প্রত্যেকটি গোত্র একাধিক গোষ্ঠী বা লিনিয়েজ-এ বিভাজিত।
গোত্রের প্রথম ভাগকে নৃবিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ম্যাক্সিমাল গোষ্ঠী। এরপর ধীরে ধীরে নিচে নামতে
থাকলে পাওয়া যায় মেজর গোষ্ঠী, মাইনর গোষ্ঠী এবং মিনিমাল গোষ্ঠী। এক একটা মাইনর লিনিয়েজ ৩
থেকে ৫টা প্রজন্মের মানুষজনকে ধারণ করে থাকে। সংহতির ব্যাপারটা হচ্ছে: যদি দুইটা মিনিমাল
লিনিয়েজ পরস্পরের সাথে গোলমাল করে তাহলে অন্য মিনিমাল গোষ্ঠী নাক গলাবে না। কিন্তু
গোলমালটা যদি হয় এমন কোন দলের সাথে যাদের সাথে আরো পুরোনো প্রজন্মের সম্পর্ক তাহলে
গোটা মাইনর গোষ্ঠী একত্রিত হয়ে যেতে পারে। এভাবে পুরো প্রক্রিয়াটা চলে। পরিশেষে সমস্তক্ষুদ্রজাতি বা ট্রাইব একত্রিত হয়ে যেতে পারে যদি আক্রমণ আসে অন্য কোন জাতি হতে। এরকম ধ্রæপদী
একটা উদাহরণ হচ্ছে নুয়ের এবং ডিংকাদের মধ্যকার দীর্ঘকাল ব্যাপী লড়াই। সংঘর্ষ এবং লড়াইয়ের
এই প্রসঙ্গ থেকে সহজেই বোঝা যায় ব্যান্ড সমাজের চেয়ে এই ধরনের সমাজে সামরিক চর্চা জোরদার
ছিল। মার্শাল সাহলিন্স মনে করেছেন যে খন্ডিত গোষ্ঠী সংগঠন শক্তিশালী ট্রাইবকে নিজেদের এলাকা
বাড়াতেও সাহায্য করেছে। কোন একটা শক্তিশালী “উপজাতি” তুলনামূলকভাবে দুর্বল জাতির বসবাস
এলাকাকে পছন্দ করলে সেটা দখল করবার চেষ্টা করতে পারত এই বৃহৎ গোষ্ঠীর আত্মীয় সম্পর্কের
কারণে। এ ছাড়াও বহু জাতির মধ্যে বছরে কোন সময়ে একত্রে কোন উৎসবে যোগ দিয়ে সংহতি প্রকাশ
করা এবং আনন্দ করবার চল ছিল। বিশেষত ইউরোপ এই সব অঞ্চল দখল করবার আগে।
ব্যান্ড সমাজের মত এখানেও নেতৃত্ব কোন আনুষ্ঠানিক ব্যাপার নয়। ক্ষমতার তুলনায় এখানেও প্রভাবই
মূল চালিকাশক্তি। সাধারণত দক্ষতা, বিচক্ষণতার মাপকাঠিতেই নেতা বা প্রধান থাকতেন কেউ।
নুয়েরদের মধ্যে গোষ্ঠীর ক্ষুদ্র অংশে বংশের কেউ একজন নেতা থাকতেন যিনি তাঁর স্থানীয় বংশ
সদস্যদের কোন রকম শাসন করতে পারতেন, কিংবা দলের জন্য ক্ষতিকর পদক্ষেপের কারণে কাউকে
একঘরে করবার উদ্যোগ নিতে পারতেন। আমেরিকার আদিবাসী জাতিসমূহের মধ্যে বিভিন্ন কাজের
জন্য বিভিন্ন রকম নেতা রাখবার রেওয়াজ ছিল। যেমন শেয়েনে জাতির মধ্যে যুদ্ধের প্রধান এবং শান্তির
প্রধান ছিল। কানাডার ওজিবোয়াদের মধ্যে যুদ্ধের নেতা, শিকারের নেতা, উৎসবের নেতা এবং গোত্র
নেতা ইত্যাদি বিভাজন ছিল। কিছু ক্ষেত্রে নেতার পদ ছিল আরও ক্ষমতাধর এবং আরও বেশি
সদস্যদের উপর চর্চা করবার মত। যেমন, দক্ষিণ ইরানের বাসেরি যাদেরকে পশুপালক যাযাবর বলা
হয়ে থাকে। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং দ্ব›দ্ব-সংঘাত নিরসনের জন্য অনাড়ম্বর ব্যবস্থা ছিল এই ধরনের
রাজনৈতিক ব্যবস্থায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মধ্যস্থতা করে এগুলো হ’ত। সংঘাত যদি “ট্রাইবে”র
ভেতরকার সদস্যদের মধ্যেই ঘটে থাকে, তাহলে নেতাগণ বিবাদকারী পক্ষকে আলোচনা করিয়ে
নিষ্পত্তি করে দেন। যদি খুন বা এরকম বড় কোন ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে ক্ষতিগ্রস্তপক্ষ যাতে
ক্ষতিপূরণ পায় তার ব্যবস্থা হয়ে থাকে। সাধারণত এই সব ক্ষেত্রে গবাদি পশু ছিল মাধ্যম, যেহেতু মূলত
পশুপালন সমাজ এগুলো। আর যদি কোন সদস্য এমন কিছু করে থাকে যাতে খোদ জাতিটিই ক্ষতিগ্রস্ত
হয় তাহলে তার ব্যবস্থা হয় ভিন্ন। এখানে একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। শেয়েনে জাতি যখন মহিষ
খন্ডিত গোষ্ঠী সংগঠন হচ্ছে
গোত্রের মধ্যকার আরও ক্ষুদ্রতর
বিভাজন
বহু জাতির মধ্যে বছরে কোন
সময়ে একত্রে কোন উৎসবে
যোগ দিয়ে সংহতি প্রকাশ করা
এবং আনন্দ করবার চল ছিল।
বিশেষত ইউরোপ এই সব
অঞ্চল দখল করবার আগে।
শিকারে বের হয় তখন যাতে কেউই মহিষদের আগে ভাগে সতর্ক করে না দেয় বা ভাগিয়ে না দেয় তার
জন্য প্রহরীর ব্যবস্থা আছে। তাঁদের কাজ কাউকে শাস্তিদেয়া নয়। তাঁরা কেবল নজরদারি করেন।
এরপরও এই ধরনের অপরাধী কেউ থাকলে প্রহরী বাহিনীর কাজ হচ্ছে সেই লোক যাতে নিজ সমাজের
নিয়ম মানে তার ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে চাবুক মারার শাস্তিহতে পারে, কিংবা ঘোড়ার কান কেটে নেয়া
যেটা খুবই লজ্জাকর হিসেবে বিবেচিত।
এখানে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা জরুরী। রাষ্ট্রবিহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে
নৃবিজ্ঞানীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জোর দিয়েছেন: ক) দ্ব›দ্ব-সংঘাত নিরসনের প্রক্রিয়ার উপর; খ) শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করবার পদ্ধতির উপর; গ) সমাজের সামরিক প্রস্তুতির উপর। এতে করে মনে হতে পারে
অ-ইউরোপীয় সমাজে দাঙ্গা-হাঙ্গামা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। পরবর্তী কালের অনেক নৃবিজ্ঞানীই এই
ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমালোচনা করেছেন এই বলে যে, এই সব গবেষণায় গবেষক আগে থেকেই ধরে
নিয়েছেন ‘সরল সমাজের’ মানুষেরা যথেষ্ট শৃঙ্খলাপরায়ন নন। তাঁদের যুক্তিতে এই সব সমাজের
“উপজাতি”সমূহের মধ্যকার অধিকাংশ দাঙ্গাই ইউরোপীয় হস্তক্ষেপে তৈরি হয়েছে। কারণ সমাজে
সম্পদের উপর তখন টান পড়েছে। উপরন্তু এসব সমাজে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ সামাল দেবার জন্য
তাদের যথেষ্ট কায়দা কানুন জানা ছিল। তাঁরা এই যুক্তিও দেখিয়েছেন যে ইউরোপের সামরিক প্রস্তুতির
সামনে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার এই সব জাতি এতটাই অসহায় ছিল যে তাদের মধ্যকার সামরিক
প্রস্তুতি আর হাঙ্গামা না দেখে ইউরোপের ভূমিকা দেখাই নৃবিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে
পারত। যেহেতু রাজনীতির অর্থ, তাঁদের মতে ক্ষমতার পার্থক্য এবং ক্ষমতার সম্পর্ক।
চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্র
এখানে অতি সংক্ষেপে চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করলেই খানিকটা পরিষ্কার হবে
ইউরোপের ভূমিকা এবং প্রথম যুগের অধিকাংশ নৃবিজ্ঞানীর ভূমিকা। নৃবিজ্ঞানীদের অনেকেই চীফডম বা
মুখিয়াতন্ত্রকে দেখতে চেয়েছেন ব্যান্ড বা ট্রাইবাল সমাজের চেয়ে উৎকৃষ্ট এবং গোছালো রাজনৈতিক
ব্যবস্থা হিসেবে। এখানে আবার স্মরণে আনা দরকার যে রাষ্ট্রবিহীন ব্যবস্থার থেকে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে উন্নত
এবং উৎকৃষ্ট হিসেবে দেখা হয়েছে। নৃবিজ্ঞানীরা রাষ্ট্রবিহীন ব্যবস্থার মধ্যে ব্যান্ড সমাজের থেকে ট্রাইব বা
ক্ষুদ্র-জাতি সমাজকে উন্নত ভেবেছেন এবং চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্রকে ভেবেছেন এর থেকে উন্নত।
বিবর্তনবাদী চিন্তার প্রভাবে এই রকম দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। এর মানে রাজনৈতিক ব্যবস্থাতে ক্রমশ
নিচু স্তর থেকে উঁচু স্তর দেখা হয় এভাবে:
ব্যান্ড সমাজÑÑ> ট্রাইব বা লোক- “উপজাতি” ÑÑ> চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্র ÑÑ> রাষ্ট্র ব্যবস্থা
ব্যান্ড সমাজে এবং ক্ষুদ্র-জাতিগত সমাজে সামাজিক নিয়ম কানুন রক্ষা করা এবং শাস্তিবিধানের জন্য
যেখানে শিথিল এবং অনাড়ম্বর পদ্ধতি ছিল, মুখিয়াতন্ত্রে এই পদ্ধতিগুলো কঠোর এবং আড়ম্বর হিসেবে
দেখা দিল। অনেক নিয়ম-কানুন পাকা পোক্ত ভাবে তৈরি হ’ল। আগে যেখানে সমাজের মুরুব্বীদের
মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নানা ধরনের ফয়সালা করা সম্ভব হ’ত সেখানে চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্রে
কতকগুলো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেয়া আছে। কিন্তু চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্রের মূল পরিচয় এখানেই সীমিত
নয়। পূর্বেকার ব্যান্ড সমাজে কিংবা ট্রাইব সমাজে মানুষের মধ্যে মর্যাদার ভেদে কিংবা সম্পদের ভিত্তিতে
অবস্থানের কোন পার্থক্য ছিল না। কিন্তু মুখিয়াতন্ত্রে মর্যাদা ভেদে সমাজের সকল মানুষের মধ্যে উঁচু-নিচু
ভেদাভেদ তৈরি হয়েছে। সমাজের সকল মানুষের মর্যাদা সেখানে নির্দিষ্ট। তাহলে চীফডম বলতে
বোঝানো হয়ে থাকে সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে সমাজের প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা নির্দিষ্ট থাকে,
মর্যাদা এবং সম্পদের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ থাকে এবং সমগ্র গোষ্ঠীর একজন আনুষ্ঠানিক
প্রধান থাকেন যাঁর শাস্তিদেবার কতকগুলি সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা থাকে। সত্যিকার অর্থে সমগ্র গোষ্ঠীর একজন
রাষ্ট্রবিহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থা
নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে
নৃবিজ্ঞানীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই
জোর দিয়েছেন: ক) দ্ব›দ্বসংঘাত নিরসনের প্রক্রিয়ার
উপর; খ) শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা
করবার পদ্ধতির উপর; গ)
সমাজের সামরিক প্রস্তুতির
উপর।
আনুষ্ঠানিক এবং ক্ষমতাবান নেতা থাকার কারণে এই ব্যবস্থা অন্যান্য রাষ্ট্র বিহীন ব্যবস্থার চেয়ে
একেবারে ভিন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পলিনেশিয়া এবং আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম উপক‚লের জাতিসমূহের মধ্যে দেখা গেছে প্রধানের সাথে যাঁর
আত্মীয়তা যত নিকট তাঁর সামাজিক মর্যাদাও তত বেশি। এর মানে প্রধানের মর্যাদার সাথে অন্যদের
মর্যাদা সম্পর্কিত। প্রধানের ধন-সম্পদ বেশি থাকার নজির পাওয়া গেছে সর্বত্র। চীফ বা প্রধানের একটা
দপ্তর থাকে, সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। সেখান থেকেই তিনি শাসন কার্যের বড় সিদ্ধান্তগুলো
নেন। অনেক চীফডমে একাধিক পরগণা বা এলাকা ভাগ করা থাকতে পারে, সবগুলোতেই আলাদা
প্রধান থাকবেন। চীফডমের প্রধানের অধীনস্ততাঁরা। কাউকে শাস্তিপ্রদানের পরিষ্কার ক্ষমতা ছিল তাঁর।
খাদ্য এবং শ্রম বণ্টন করবার সামর্থ্যও তাঁর স্বীকৃত। যেমন ফিজিয়ান চীফডমে চীফের দায়িত্ব ছিল খাদ্য
পুনর্বণ্টন এবং শ্রমশক্তি নিয়োগ করার তদারকি করা। একটা বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মুখিয়াতন্ত্রে সামরিক
প্রস্তুতি আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে অনেক জোরদার ছিল। সাধারণভাবে পশুপালক সমাজে এবং
সাধারণ কৃষিভিত্তিক সমাজে চীফডমের অস্তিত্ব পেয়েছেন নৃবিজ্ঞানীরা।
এখানে একটা বিষয় আলোচনা করা দরকার। ইউরোপীয় শাসকরা যখন বিভিন্ন অঞ্চলে গেছে তখন
চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্রের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। দুই একটা অঞ্চলে যে ধরনের চীফডম ছিল সেখানে
চীফের ক্ষমতা কিংবা নিয়ন্ত্রণ কোনটাই তেমন তীব্র ছিল না। আজকের নৃবিজ্ঞানীদের অনেকেই ব্যাখ্যা
করছেন যে ইউরোপের শাসকরা এই ধরনের চীফডম তৈরি করেছে। আর নৃবিজ্ঞানীরা সেটাই পর্যবেক্ষণ
করে এসেছেন। খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে অনেক চীফডমের চীফদের ক্ষমতা কাগজে কলমে সংরক্ষিত
ছিল। তার মানে হ’ল আধুনিক রাষ্ট্রের আইন দ্বারা চীফের ক্ষমতা স্বীকৃত। সহজেই বোঝা যায় এই
স্বীকৃতি কারা দিচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ঔপনিবেশিক শাসন কাজ চালাবার সুবিধায় এবং মানুষজনকে
নিয়ন্ত্রণ করবার কাজটা সহজ করবার জন্য ইউরোপের শাসকরা এই পদটা দাঁড় করিয়েছে। সেটা
বোঝার জন্য আমরা কাস্টমারি ল’ বা প্রথাগত আইনের কথা বলতে পারি। আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন
আমেরিকার সমাজে ঔপনিবেশিক আমলে কাস্টমারি ল’ লিপিবদ্ধ হয়েছে। তার মানে ইউরোপের
শাসনের আগে ঐ আইনগুলো একই রকম ছিল না এবং তার তীব্রতাও ছিল না। যেহেতু লেখ্য আইনের
শাসন শক্তি বেশি। চীফডম আসলে আধুনিক পদ্ধতিতে মানুষজনকে নিয়ন্ত্রণ করবার প্রাথমিক পদক্ষেপ
ছিল।
সারাংশ
রাষ্ট্রবিহীন সমাজের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে নৃবিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন। নৃবিজ্ঞানের প্রচলিত
ধারণায় সমাজের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলি হচ্ছে: ব্যান্ড সমাজ,
ট্রাইবাল বা “উপজাতি” সমাজ, চীফডম বা মুখিয়া তন্ত্র এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এ
ধরনের ব্যবস্থার উদাহরণ সংগ্রহ করেছেন নৃবিজ্ঞানীরা। অনেক নৃবিজ্ঞানীর মতে নৃবিজ্ঞানীদের দেখা এই
সকল সমাজ তখন বহির্শক্তি দ্বারা প্রভাবিত ছিল। বিশেষভাবে চীফডমের কথা এখানে বলা হয়।
ইউরোপের শক্তি বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে নেবার পর রাষ্ট্র ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে
ফেলা হয়।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন
নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন
সঠিক উত্তরের পাশে টিক () চিহ্ন দিন -
প্রধানের সাথে যাঁর আত্মীয়তা
যত নিকট তাঁর সামাজিক
মর্যাদাও তত বেশি। এর মানে
প্রধানের মর্যাদার সাথে অন্যদের
মর্যাদা সম্পর্কিত। প্রধানের ধনসম্পদ বেশি থাকার নজির
পাওয়া গেছে সর্বত্র। চীফ বা
প্রধানের একটা দপ্তর থাকে,
সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ
পার্থক্য। সেখান থেকেই তিনি
শাসন কার্যের বড় সিদ্ধান্তগুলো
নেন।
১। বলিভিয়ার আমাজান বেসিনের ‘সিরিওনো’ জাতির মধ্যে কোন ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা
প্রচলিত?
ক. ব্যান্ড সমাজ খ. ট্রাইব
গ. চীফডম ঘ. রাষ্ট্র
২। নৃবিজ্ঞানীরা ট্রাইব সমাজের রাজনৈতিক চালিকা শক্তির মূল কেন্দ্র মনে করেছেন --- ----------
---।
ক. অর্থনৈতিক স¤পর্ককে খ.জ্ঞাতি সম্পর্ককে
গ. সামাজিক সম্পর্ককে ঘ. উপরের কোনটিই নয়
৩। বিবর্তনবাদী চিন্তায় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ক্রমশ নীচু স্তর থেকে উচু স্তর দেখা হয় কিভাবে?
ক. ব্যান্ড  ট্রাইব বা লোক - ‘উপজাতী’ চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা
খ. ট্রাইব বা লোক - ‘উপজাতী’  ব্যান্ড  চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা
গ. ব্যান্ড  চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্র ট্রাইব বা লোক - ‘উপজাতী’  রাষ্ট্রব্যবস্থা
ঘ. উপরের কোনটিই নয়
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
১। নৃবিজ্ঞানীরা ব্যান্ড সমাজের কী বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করেছেন?
২। মুখিয়াতন্ত্র বা চীফডম বলতে নৃবিজ্ঞানীরা কী বুঝিয়েছেন?
রচনামূলক প্রশ্ন
১। ট্রাইবাল বা “উপজাতীয়” রাজনৈতিক ব্যবস্থা হচ্ছে সংঘভিত্তিক ব্যবস্থা Ñ ব্যাখ্যা করুন।
২। প্রাক্-রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রবিহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবলুপ্ত হবার কারণ ও প্রেক্ষাপটকে আপনি কীভাবে
দেখেন?
রাষ্ট্রব্যবস্থা

FOR MORE CLICK HERE
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস মাদার্স পাবলিকেশন্স
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস ১ম পর্ব
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস
আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস
বাংলাদেশের ইতিহাস মধ্যযুগ
ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস
মুঘল রাজবংশের ইতিহাস
সমাজবিজ্ঞান পরিচিতি
ভূগোল ও পরিবেশ পরিচিতি
অনার্স রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রথম বর্ষ
পৌরনীতি ও সুশাসন
অর্থনীতি
অনার্স ইসলামিক স্টাডিজ প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত
অনার্স দর্শন পরিচিতি প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত

Copyright © Quality Can Do Soft.
Designed and developed by Sohel Rana, Assistant Professor, Kumudini Government College, Tangail. Email: [email protected]