শাপভ্রষ্ট কবি: বুদ্ধদেব বসু

যৌবনের উচ্ছ্বসিত সিন্ধুতটভূমে

বসে আছি আমি ।

দগ্ধ স্বর্ণ-রেণু-সম বালুকণারাশি

লুটায় চরণ-প্রান্তে অকৃপণ বিপুল বৈভবে ।

ঊর্দ্ধে মম রক্তিম আকাশ—

প্রভাত-সূর্যের লজ্জা রঞ্জিত করিছে অরণ্যানী ।

সদ্য-নিদ্রা-জাগরিত গগনের পাণ্ডুভাল-’ পরে

বহ্নি-শিখা করিছে অর্পণ :

কামনার বহ্নি সে যে, স্বপনের সলজ্জ বিকাশ ।

গোলাপের বর্ণে-বর্ণে স্বপ্ন-সুধা মাখা,

আরক্তিম কামনায় আঁকা ।

আমার অন্তর নিয়ে একাকী বসিয়া আছি আমি

উচ্ছ্বসিত যৌবনের সিন্ধুতীরে ।



সম্মুখে গরজে সিন্ধু বেদনার দুঃসহ পীড়নে ।

লক্ষ-লক্ষ লুব্ধ ওষ্ঠ মেলি’

চুম্বিয়া মুছিতে চাহে গগনের তরুণ রক্তিমা,

রিক্ত করি’ দিতে চাহে ধরিত্রীর তীর্থযাত্রীদলে

সহসা-বন্যায় ।

নিষ্ফল আক্রোশে তার ক্রূর জিহ্বা উদ্ গারিছে বিষ,

তরঙ্গ-মথিত ফেনা রেখে যায় সৈকত-শিয়রে ।

গাঢ়কৃষ্ণ জলরাশি অস্বচ্ছ অতল

নিত্য-নব অমঙ্গলে করে জন্মদান

গোপন গভীর গর্ভে ;

অকল্যাণ বায়ু বহি’ প্রাণের মন্দিরে

নির্বাপিত করি’ দেয় পূজার প্রদীপ ;

ম্লানমুখে ঝরি’ পড়ে কাননে অষ্ফুট শেফালিকা

হিমস্পর্শে  তার ।

আমি শুষ্ক, নিশাচর, অন্ধকারে মোর সিংহাসন ।

আমি হিংস্র, দুরন্ত, পাশব ।

সুন্দর ফিরিয়া যায় অপমানে, অসহ্য লজ্জায়

হেরি মোর রুদ্ধদ্বার, অন্ধকার মন্দির-প্রাঙ্গণ ।

সুদূর কুসুম-গন্ধে তার যাত্রা-বাঁশি বেজে ওঠে ;

দৈন্য-ভরা গৃহ মোর শূন্যতায় করে হাহাকার ।

—-যৌবন আমার অভিশাপ ।

ক্ষণে ক্ষণে তরঙ্গের ‘পরে

গগনের স্নিগ্ধ শান্ত আলোখানি বিচ্ছুরিত হয়ে যেন লাগে ;

ফুটে ওঠে সোনার কমল

ক্ষণিক সৌরভে তার নিখিলের করিয়া বিহ্বল ।

সেই পদ্মগব্ধখানি এনে দেয় মোর পরিচয়

পল্লব-সম্পুটে ।

বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়ে পড়ি আমি লিখন তাহার :

‘হে তরুণ, দস্যু নহ, পশু নহ, নহ তুচ্ছ কাট—

শাপভ্রষ্ট দেব তুমি ।’



শাপভ্রষ্ট দেব আমি !

আমার নয়ন তাই বন্দী যুগ-বিহঙ্গের মতো

দেহের বন্ধন ছিঁড়ি শূন্যতায় উড়ি’ যেতে চায়

আকন্ঠ করিতে পান আকাশের উদার নীলিমা ।

তাই মোর দুই কর্ণে অরণ্যের পল্লবমর্মর

প্রেম-গুঞ্জনের মত কী অমৃত ঢালে মর্ম-মাঝে ।

রবির গভীর স্নেহে, শিশিরের শীতল প্রণয়ে

শুষ্ক শাখে তাই ফোটে ফুল,

দক্ষিণ-পবন তারে মৃদুহাস্যে আন্দোলিয়া যায় ।

রাত্রির রাজ্ঞীর বেশে পূর্ণচন্দ্র কভু দেয় দেখা,

আঁধারের অশ্রুকণা তারার মণিকা হয়ে জ্বলে

ত্রিযামার জাগরণ-তলে ।

স্তব্ধচিত্তে চেয়ে থাকি ; অন্তরের নিরুদ্ধ বেদনা

সযত্নে সাজাই নিত্য উত্সবের প্রদীপের মতো

আনন্দের মন্দির-সোপানে ।

সুধায় নির্মিত মোর দেহ-সৌধখানি,

ইন্দ্রিয় তাহার বাতায়ন—

মুক্ত করি’ রাখি’ তারে আকাশের অকূল আলোকে

অন্ধকার-অন্তরালে অন্তরের মাঝে

বিনিঃশেষে করি যে গ্রহণ !



অক্ষম, দুর্বল আমি নিঃসম্বল নীলাম্বর-তলে,

ভঙ্গুর হৃদয়ে মম বিজড়িত সহস্র পঙ্গুতা—

জীবনের দীর্ঘ পথে করেছিনু কোন্

                       স্বর্ণরেখাদীপ্ত ঊষাকালে—

আজ তার নাহিকো আভাস ।

আজ আমি ক্লান্ত হয়ে পথ-প্রান্তে পড়ে আছি

                       নীরব ব্যথায় শান্তমুখে

ঝ’রে-পড়া বকুলের গন্ধস্নিগ্ধ বিজন বিপিনে ।

সেই মোর গোধূলির সুরভি আঁধারে

যার সাথে দেখা,

যার সাথে সঙ্গোপনে প্রণয়-গুঞ্জন,

যার স্পর্শে ক্ষণে-ক্ষণে হৃদয়ের বেদনার মেঘে

চমকিয়া থেলি’ যায় হর্ষের বিজলী ;—-

নেত্রের মুকুরে তার দেখেছি আপন প্রতিচ্ছবি,

দেখিয়াছি দিনে দিনে, ক্ষণে-ক্ষণে আপনার ছায়া,

দেখিয়াছি কান্তি মম দেবতার মতো অপরূপ,

ভাস্করের মতো জ্যোতির্ময় ;—-

তখন বিষণ্ণ বায়ু নিঃশ্বসি’ কহিয়া গেছে কানে :

‘শাপভ্রষ্ট দেব তুমি !’

নিকুঞ্জের সঙ্গী মোর হাসিয়া কয়েছে যবে কথা

তুচ্ছতম বাণী তার রূপান্তর করেছে গ্রহণ,

বিহঙ্গের উদাসীন কলকন্ঠ-সাথে মিশি’ আসি’

বেজেছে আমার বক্ষে দুরাশার মতো—

‘শাপভ্রষ্ট দেব তুমি !’

তাই আজ ভাবি মনে মনে—

পঙ্কের-কলঙ্ক-বারি উত্তরিয়া আছে মোর স্থান

পঙ্কজের শুভ্র অঙ্কে ।

শেফালি সৌরভ আমি, রাত্রির নিঃশ্বাস,

ভোরের ভৈরবী ।

সংসারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কন্টকের তুচ্ছ উত্পীড়ণ

হাস্যমুখে উপেক্ষিয়া চলি ।

যেথা যত বিপুল বেদনা,

যেথা যত আনন্দের মহান্ মহিমা—

আমার হৃদয়ে তার নব-নব হয়েছে প্রকাশ ।

বকুল-বীথির ছায়ে গোধূলির অস্পষ্ট মায়ায়

অমাবস্যা-পূর্ণিমার পরিণয়ে আমি পুরোহিত ।–

শাপভ্রষ্ট দেবশিশু আমি !