অভিলাষ  - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



জনমনোমুগ্ধকর উচ্চ অভিলাষ!

তোমার বন্ধুর পথ অনন্ত অপার ।

অতিক্রম করা যায় যত পান্থশালা ,

তত যেন অগ্রসর হতে ইচ্ছা হয় ।





তোমার বাঁশরি স্বরে বিমোহিত মন —

মানবেরা , ওই স্বর লক্ষ্য করি হায় ,

যত অগ্রসর হয় ততই যেমন

কোথায় বাজিছে তাহা বুঝিতে না পারে ।





চলিল মানব দেখো বিমোহিত হয়ে ,

পর্বতের অত্যুন্নত শিখর লঙ্ঘিয়া ,

তুচ্ছ করি সাগরের তরঙ্গ ভীষণ ,

মরুর পথের ক্লেশ সহি অনায়াসে ।





হিমক্ষেত্র , জনশূন্য কানন , প্রান্তর ,

চলিল সকল বাধা করি অতিক্রম ।

কোথায় যে লক্ষ্যস্থান খুঁজিয়া না পায় ,

বুঝিতে না পারে কোথা বাজিছে বাঁশরি ।





ওই দেখো ছুটিয়াছে আর-এক দল ,

লোকারণ্য পথমাঝে সুখ্যাতি কিনিতে ;

রণক্ষেত্রে মৃত্যুর বিকট মূর্তি মাঝে ,

শমনের দ্বার সম কামানের মুখে ।





ওই দেখো পুস্তকের প্রাচীর মাঝারে

দিন রাত্রি আর স্বাস্থ্য করিতেছে ব্যয় ।

পহুঁছিতে তোমার ও দ্বারের সম্মুখে

লেখনীরে করিয়াছে সোপান সমান ।





কোথায় তোমার অন্ত রে দুরভিলাষ

‘ স্বর্ণঅট্টালিকা মাঝে ?' তা নয় তা নয় ।

‘ সুবর্ণখনির মাঝে অন্ত কি তোমার ?'

তা নয় , যমের দ্বারে অন্ত আছে তব ।





তোমার পথের মাঝে , দুষ্ট অভিলাষ ,

ছুটিয়াছে মানবেরা সন্তোষ লভিতে ।

নাহি জানে তারা ইহা নাহি জানে তারা ,

তোমার পথের মাঝে সন্তোষ থাকে না!





নাহি জানে তারা হায় নাহি জানে তারা

দরিদ্র কুটির মাঝে বিরাজে সন্তোষ ।

নিরজন তপোবনে বিরাজে সন্তোষ ।

পবিত্র ধর্মের দ্বারে সন্তোষ আসন ।



১০

নাহি জানে তারা ইহা নাহি জানে তারা

তোমার কুটিল আর বন্ধুর পথেতে

সন্তোষ নাহিকো পারে পাতিতে আসন ।

নাহি পশে সূর্যকর আঁধার নরকে ।



১১

তোমার পথেতে ধায় সুখের আশয়ে

নির্বোধ মানবগণ সুখের আশয়ে ;

নাহি জানে তারা ইহা নাহি জানে তারা

কটাক্ষও নাহি করে সুখ তোমা পানে ।



১২

সন্দেহ ভাবনা চিন্তা আশঙ্কা ও পাপ

এরাই তোমার পথে ছড়ানো কেবল

এরা কি হইতে পারে সুখের আসন

এ-সব জঞ্জালে সুখ তিষ্ঠিতে কি পারে ।



১৩

নাহি জানে তারা ইহা নাহি জানে তারা

নির্বোধ মানবগন নাহি জানে ইহা

পবিত্র ধর্মের দ্বারে চিরস্থায়ী সুখ

পাতিয়াছে আপনার পবিত্র আসন ।



১৪

ওই দেখো ছুটিয়াছে মানবের দল

তোমার পথের মাঝে দুষ্ট অভিলাষ

হত্যা অনুতাপ শোক বহিয়া মাথায়

ছুটেছে তোমার পথে সন্দিগ্ধ হৃদয়ে ।



১৫

প্রতারণা প্রবঞ্চনা অত্যাচারচয়

পথের সম্বল করি চলে দ্রুতপদে

তোমার মোহন জালে পড়িবার তরে ।

ব্যাধের বাঁশিতে যথা মৃগ পড়ে ফাঁদে ।



১৬

দেখো দেখো বোধহীন মানবের দল

তোমার ও মোহময়ী বাঁশরির স্বরে

এবং তোমার সঙ্গী আশা উত্তেজনে

পাপের সাগরে ডুবে মুক্তার আশয়ে ।



১৭

রৌদ্রের প্রখর তাপে দরিদ্র কৃষক

ঘর্মসিক্ত কলেবরে করিছে কর্ষণ

দেখিতেছে চারি ধারে আনন্দিত মনে

সমস্ত বর্ষের তার শ্রমের যে ফল ।



১৮

দুরাকাঙ্ক্ষা হায় তব প্রলোভনে পড়ি

কর্ষিতে কর্ষিতে সেই দরিদ্র কৃষক

তোমার পথের শোভা মনোময় পটে

চিত্রিতে লাগিল হায় বিমুগ্ধ হৃদয়ে ।



১৯

ওই দেখো আঁকিয়াছে হৃদয়ে তাহার

শোভাময় মনোহর অট্টালিকারাজি

হীরক মাণিক্য পূর্ণ ধনের ভাণ্ডার

নানা শিল্পে পরিপূর্ণ শোভন আপণ ।



২০

মনোহর কুঞ্জবন সুখের আগার

শিল্প-পারিপাট্যযুক্ত প্রমোদভবন

গঙ্গা সমীরণ স্নিগ্ধ পল্লীর কানন

প্রজাপূর্ণ লোভনীয় বৃহৎ প্রদেশ ।



২১

ভাবিল মুহূর্ত-তরে ভাবিল কৃষক

সকলই এসেছে যেন তারি অধিকারে

তারি ওই বাড়ি ঘর তারি ও ভাণ্ডার

তারি অধিকারে ওই শোভন প্রদেশ ।



২২

মুহূর্তেক পরে তার মুহূর্তেক পরে

লীন হল চিত্রচয় চিত্তপট হতে

ভাবিল চমকি উঠি ভাবিল তখন

‘ আছে কি এমন সুখ আমার কপালে ?'



২৩

‘ আমাদের হায় যত দুরাকাঙ্ক্ষাচয়

মানসে উদয় হয় মুহূর্তের তরে

কার্যে তাহা পরিণত না হতে না হতে

হৃদয়ের ছবি হায় হৃদয়ে মিশায় । '



২৪

ওই দেখো ছুটিয়াছে তোমার ও পথে

রক্তমাখা হাতে এক মানবের দল

সিংহাসন রাজদণ্ড ঐশ্বর্য মুকুট

প্রভুত্ব রাজত্ব আর গৌরবের তরে ।



২৫

ওই দেখো গুপ্তহত্যা করিয়া বহন

চলিতেছে অঙ্গুলির ‘ পরে ভর দিয়া

চুপি চুপি ধীরে ধীরে অলক্ষিত ভাবে

তলবার হাতে করি চলিয়াছে দেখো ।



২৬

হত্যা করিতেছে দেখো নিদ্রিত মানবে

সুখের আশয়ে বৃথা সুখের আশয়ে

ওই দেখো ওই দেখো রক্তমাখা হাতে

ধরিয়াছে রাজদণ্ড সিংহাসনে বসি ।



২৭

কিন্তু হায় সুখলেশ পাবে কি কখন ?

সুখ কি তাহারে করিবেক আলিঙ্গন ?

সুখ কি তাহার হৃদে পাতিবে আসন ?

সুখ কভু তারে কিগো কটাক্ষ করিবে ?



২৮

নরহত্যা করিয়াছে যে সুখের তরে

যে সুখের তরে পাপে ধর্ম ভাবিয়াছে

বৃষ্টি বজ্র সহ্য করি যে সুখের তরে

ছুটিয়াছে আপনার অভীষ্ট সাধনে ?



২৯

কখনোই নয় তাহা কখনোই নয়

পাপের কী ফল কভু সুখ হতে পারে

পাপের কী শাস্তি হয় আনন্দ ও সুখ

কখনোই নয় তাহা কখনোই নয়



৩০

প্রজ্বলিত অনুতাপ হুতাশন কাছে

বিমল সুখের হায় স্নিগ্ধ সমীরণ

হুতাশনসম তপ্ত হয়ে উঠে যেন

তখন কি সুখ কভু ভালো লাগে আর ।



৩১

নরহত্যা করিয়াছে যে সুখের তরে

যে সুখের তরে পাপে ধর্ম ভাবিয়াছে

ছুটেছে না মানি বাধা অভীষ্ট সাধনে

মনস্তাপে পরিণত হয়ে উঠে শেষে ।



৩২

হৃদয়ের উচ্চাসনে বসি অভিলাষ

মানবদিগকে লয়ে ক্রীড়া কর তুমি

কাহারে বা তুলে দাও সিদ্ধির সোপানে

কারে ফেল নৈরাশ্যের নিষ্ঠুর কবলে ।



৩৩

কৈকেয়ী হৃদয়ে চাপে দুষ্ট অভিলাষ!

চতুর্দশ বর্ষ রামে দিলে বনবাস ,

কাড়িয়া লইলে দশরথের জীবন ,

কাঁদালে সীতায় হায় অশোক-কাননে ।



৩৪

রাবণের সুখময় সংসারের মাঝে

শান্তির কলস এক ছিল সুরক্ষিত

ভাঙিল হঠাৎ তাহা ভাঙিল হঠাৎ

তুমিই তাহার হও প্রধান কারণ ।



৩৫

দুর্যোধন-চিত্ত হায় অধিকার করি

অবশেষে তাহারেই করিলে বিনাশ

পাণ্ডুপুত্রগণে তুমি দিলে বনবাস

পাণ্ডবদিগের হৃদে ক্রোধ জ্বালি দিলে ।



৩৬

নিহত করিলে তুমি ভীষ্ম আদি বীরে

কুরুক্ষেত্র রক্তময় করে দিলে তুমি

কাঁপাইলে ভারতের সমস্ত প্রদেশ

পাণ্ডবে ফিরায়ে দিলে শূন্য সিংহাসন ।



৩৭

বলি না হে অভিলাষ তোমার ও পথ

পাপেতেই পরিপূর্ণ পাপেই নি র্মি ত

তোমার কতকগুলি আছয়ে সোপান

কেহ কেহ উপকারী কেহ অপকারী ।



৩৮

উচ্চ অভিলাষ! তুমি যদি নাহি কভু

বিস্তারিতে নিজ পথ পৃথিবীমণ্ডলে

তাহা হ ' লে উন্নতি কি আপনার জ্যোতি

বিস্তার করিত এই ধরাতল-মাঝে ?



৩৯

সকলেই যদি নিজ নিজ অবস্থায়

সন্তুষ্ট থাকিত নিজ বিদ্যা বুদ্ধিতেই

তাহা হ ' লে উন্নতি কি আপনার জ্যোতি

বিস্তার করিত এই ধরাতল-মাঝে ?