আমাকে তুমি - জীবনানন্দ দাশ

আমাকে

তুমি দেখিয়েছিলে একদিন;

মস্ত বড় ময়দান — দেবদারু পামের নিবিড় মাথা — মাইলের পর মাইল;

দুপুরবেলার জনবিরল গভীর বাতাস

দূর শূন্যে চিলের পাটকিলে ডানার ভিতর অস্পষ্ট হয়ে হারিয়ে যায়;

জোয়ারের মতো ফিরে আসে আবার;



জানালায় জানালায় অনেক ক্ষণ ধরে কথা বলে:

পৃথিবীকে মায়াবী নদীর পারের দেশ বলে মনে হয়।

তারপর

দূরে

অনেক দূরে

খররৌদ্রে পা ছড়িয়ে বর্ষীয়সী রূপসীর মাতা ধান ভানে — গান গায় — গান গায়

এই দুপুরের বাতাস।



এক-একটা দুপুরে এক-একটা পরিপুর্ণ জীবন অতিবাহিত হয়ে যায় যেন।

বিকেলে নরম মুহুর্ত;

নদীর জলের ভিতর শম্বর, নীলগাই, হরিণের ছায়ার আসা যাওয়া;

একটা ধবর চিতল-হরিণীর ছায়া

আতার ধূসর ক্ষীরে গড়া মুর্তির মতো

নদীর জলে

সমস্ত বিকেলবেলা ধরে

স্থির!



মাঝে মাঝে অনেক দূর থেকে শ্মশানের চন্দনকাঠের চিতার গন্ধ

আগুণের — ঘিয়ের ঘ্রাণ;

বিকেলে

অসম্ভব বিষন্নতা।

ঝাউ হরিতকী শাল, নিভস্ত সূর্যে

পিয়াশাল পিয়াল আমলকী দেবদারু–

বাতাসের বুকে স্পৃহা, উৎসাহ, জীবনের ফেনা;



শাদা শাদাছিট কালো পায়রার ওড়াওড়ি জোছনায়–ছায়ায়,

রাত্রি;

নক্ষত্র ও নক্ষত্রের

অতীত নিস্তব্ধতা!



মরণের পরপারে বড়ো অন্ধকার

এই সব আলো প্রেম ও নির্জনতার মতো।