এই নিদ্রা - জীবনানন্দ দাশ

আমার জীবনে কোনো ঘুম নাই

মৎস্যনারীদের মাঝে সবচেয়ে রূপসী সে নাকি

এই নিদ্রা?



গায় তার ক্ষান্ত সমুদ্রের ঘ্রাণ- অবসাদ সুখ

চিন্তার পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন-বিমুখ

প্রাণ তার



এই দিন এই রাত্রি আসে যায়- বুঝিতে দেয় না তারে; কোনো ধ্বনি ঘ্রাণ

কোনো ক্ষুধা- কোনো ইচ্ছা- পরীরো সোনার চুল হয় যাতে ম্লানঃ

আমাদের পৃথিবীর পরীদের;- জানেনা সে; শোনেনা সে

জীবনের লক্ষ্য মৃত নিঃশ্বাসের স্বর;

তাহলে ঘুমাত কবে; সে শুধু সুন্দর,

প্রশ্নহীন অভিজ্ঞতাহীন দূর নক্ষত্রের মতো

সুন্দর অমর শুধু; দেবতারা করেনি বিক্ষত

ইহাদের।



এদের অপার রূপ শান্তি সচ্ছলতা

তবুও জানিত যদি আমার এ-জীবনের মুহূর্তের কথা

মানুষের জীবনের মুহূর্তের কথা।



দেবতারা করেনি বিক্ষত ইহাদেরঃ

(দেবতারা করেনি বিক্ষত নিজেদের

কোনো অভিজ্ঞতা নাই দেবতার)

ঘুঘুদের শাদা ডানা- নীল রাত্রি- কমলরঙের মেঘ- সমুদ্রের ফেনা রোদ-

হরিণের বুকে বেদনার

নীরব আঘাত;

এরা প্রশ্ন করেনাকোঃ ইহারা সুন্দর শান্ত- জীবনের উদ্‌যাপনে সন্দেহের হাত

ইহারা তোলে না কেউ আঁধারে আকাশে

ইহাদের দ্বিধা নাই- ব্যথা নাই- চোখে ঘুম আসে।

শুনেছে কে ইহাদের মুখে কোনো অন্ধকার কথা?

সকল সংকল্প চিন্তা রক্ত আনে ব্যথা আনে- মানুষের জীবনের এই বীভৎসা

ইহাদের ছোঁয় নাকো;-

ব্যুবনিক প্লেগের মতন

সকল আচ্ছন্ন শান্ত স্নিগ্ধতারে নষ্ট ক'রে ফেলিতেছে মানুষের মন!



গোলাপী ধূসর মেঘে পশ্চিমের বিয়োগ সে দ্যাখে না কি?

প্রজাপতি পাখি-মেয়ে করেনা কি মানুষের জীবনের ব্যথা আহরণ?

তবু এরা ব্যথা নয়ঃ ইহারা আবৃত সব- বিচিত্র- নীরব

অবিরল জাদুঘর এরা এক;- এরা রূপ ঘুম শান্তি স্থির

এই মৃত পাখি কীট- প্রজাপতি রাঙা মেঘ- সাপের আঁধার মুখে

ফরিঙের জোনাকির নীড়

এইসব।

আমি জানি, একদিন আমিও এমন

পতঙ্গের হৃদয়ের ব্যথা হব- সমুদ্রের ফেনা শাদা ফেনায় যেমন

ভেঙে পড়ে- ব্যথা পায়।

মানুষের মন

তবুও রক্তাক্ত হয় কেন এক অন্য বেদনায়

কীট যাহা জানে নাকো- জানে নাকো নদী ফেনা ঘাসরোদ- শিশির কুয়াশা

জ্যোৎস্নাঃ আম্লান হেলিওট্রোপ হায়!

এ-সৃষ্টির জাদুঘরে রূপ তারা- শান্তি- ছবি- তাহারা ঘুমায়

সৃষ্টি তাই চায়।



ভুলে যাব যেই সাধ- যে-সাহস এনেছিলো মানুষ কেবল

যাহা শুধু গ্লানি হলো- কৃপা হলো- নক্ষত্রের ঘৃণা হলো-

অন্য কোনো স্থল

পেল নাকো।