সুনাগরিকের গুণাবলী, সুনাগরিকের গুরুত্ব , বিশ্বনাগরিকতা কি?

সাধারণভাবে গণতান্ত্রিক সমাজের বিকাশের জন্য আবশ্যকীয় গুণাবলী যে নাগরিকদের মধ্যে বিদ্যমান

তাকে সুনাগরিক বলা হয়। একটি দেশ জাতির সুখ্যাতি ও অগ্রগতিতে সুনাগরিকের গুরুত্ব অপরিসীম।

সুনাগরিক দেশ ও জাতির মূল্যবান সম্পদ। একটি রাষ্ট্রের মান-মর্যাদা ও শৌর্য-বীর্যের জলন্ত প্রতীক

হলো সুনাগরিকবৃন্দ। এজন্যেই বিভিন্ন চিন্তাবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ সমাজের সার্বিক কল্যাণে

সুনাগরিকের কতকগুলো গুণাবলীর কথা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।

সুনাগরিক ছাড়া সমাজ সুন্দর ও সার্থক হতে পারে না। অধ্যাপক ই, এম, হোয়াইটের মতে

সুনাগরিকের গুণাবলী হলো− জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠা। সুনাগরিকের গুণাবলী সম্বন্ধে লর্ড ব্রাইসের অভিমত

প্রণিধানযোগ্য। তাঁর মতে সুনাগরিকের তিনটি গুণ থাকা আবশ্যক। গুণগুলো হলো বুদ্ধি, আত্মসংযম

ও বিবেক। লর্ডব্রাইস ও ইম, এম হোয়াইট সুনাগরিকের বৈশিষ্ট্যের চ‚ড়ান্ত বিশ্লেষণে একই ধরনের

উক্তি করেছেন। নি¤েœ সুনাগরিকের গুণাবলী সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

বুদ্ধি

বুদ্ধিমত্তা সুনাগরিকের একটি বিশেষ গুণ। নাগরিকবৃন্দ বুদ্ধিমান হলে একটি জাতি দ্রুত গতিতে উন্নতি

লাভ করতে পারে। আমরা জানি বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেন জাপান ও জার্মানীর নাগরিকবৃন্দ

বুদ্ধিমত্তা দিয়েই উন্নতির চরম শিখরে অবস্থান করছে। বুদ্ধির দ্বারা মানুষ অচেনাকে চিনতে পারে

অজানাকে জানতে পারে এবং অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। সরকারের কর্মকান্ডে, নীতি নির্ধারণে

এবং নানাবিধ জটিল সমস্যার সমাধানকল্পে বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান নাগরিক গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন

করতে পারে। একমাত্র বুদ্ধিমান নাগরিকই জাতিকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে সক্ষম।

বিবেক

বিবেকবান মানুষ হচ্ছেন আদর্শ নাগরিক। বিবেক মানুষকে অন্তর্নিহিত সত্যের সন্ধান দেয়। বিবেকের

মাধ্যমেই মানুষ সত্য-মিথ্যা, ন্যায় -অন্যায়, ভাল-মন্দের যাচাই-বাছাই করতে পারে। নিঃসন্দেহে

একথা বলা যায় যে বিবেক সম্পন্ন নাগরিক হচ্ছে দেশ ও জাতির শক্তি । রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য

পালনের ক্ষেত্রে বিবেক ও প্রজ্ঞা নাগরিকদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। অতএব নাগরিকদের

কাক্সিক্ষত ভ‚মিকা পালনের জন্য তাদেরকে অবশ্যই বিবেক ও বিচক্ষণতা সম্পন্ন হতে হবে। বিবেকের

আহবানে নাগরিক কুপথ ছেড়ে সুপথে পরিচালিত হয়। স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয়

স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিবেক তার অতন্ত্র প্রহরী হিসেবে কাজ করে।

আত্মসংযম

আত্মসংযম মানুষের একটি মহৎ গুণ। আত্মসংযমী মানুষ লোভ-লালসা, নীচতা- হীনতা, স্বার্থপরতা

জয় করে দেশ ও জাতির সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারে। সমাজের শান্তি ও উন্নতির জন্যে

নাগরিককে অবশ্যই আত্মসংযমী হতে হবে। পারিবারিক সামাজিক ও জাতীয় জীবনে একে অন্যের

মতামত সহ্য করার সংযম ও সহনশীলতা প্রতিটি নাগরিকের অর্জন করতে হবে। গণতান্ত্রিক সমাজের

স্বাধীনতার জন্য নাগরিকদের অবশ্যই সংযমী হতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে আত্মসংযমী ও

সহনশীল জাতিই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি। আত্মসংযম শুধু ব্যক্তি জীবনেই নয় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও
বয়ে নিয়ে আসে শান্তি, সম্প্রীতি আর কল্যাণ।
সুনাগরিকের লক্ষণ
হল বুদ্ধি, বিবেক ও
আত্মসংযম।
সুনাগরিক দেশীও
জাতির ও মূল্যবান
সম্পদ।


এ তিনটি মৌলিক গুণাবলী ছাড়াও সুনাগরিককে আরও কতকগুলো সাধারণ গুণাবলী অর্জন করতে

হবে। যেমন−

১। সুশিক্ষিত হওয়া;

২। সমাজের ও রাষ্ট্রের নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলা;

৩। নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া;

৪। সহনশীল ও ধৈর্যশীল হওয়া;

৫। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা;

৬। স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব রক্ষা করা;

৭। স্বৈরাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা;

৮। দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা;

৯। সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করা।

বিশ্বনাগরিকতা

আধুনিকযুগে নাগরিকতার ধারণা জাতীয় ও নগর রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বনাগরিকতার রূপ

ধারণ করেছে। নাগরিকতার ধারণা আজ সীমিত গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা একদিকে যেমনি

একটি রাষ্ট্রের নাগরিক অন্যদিকে আবার বিশ্বনাগরিক। রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে আমরা সকল

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানেরও সদস্য। জ্ঞান-বিজ্ঞানের জয়যাত্রা, তথ্য-প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি এবং

যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিরাট সাফল্য অর্জিত হওয়ায় মানুষে মানুষে জাতিতে জাতিতে ঘনিষ্ট

সম্পর্ক গড়ে তোলার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। কোন সচেতন নাগরিকই বিশ্বের সমস্যাবলী সম্পর্কে

উদাসীন থাকতে পারে না। পৃথিবীর কোথাও মানবতা বিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হলে সমগ্র

বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ উত্থাপিত হয়। বর্তমান বিশ্বে কোন নাগরিক বা রাষ্ট্র বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতে

পারে না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কোন রাষ্ট্রই আজ সয়ংসম্পূর্ণ নয়। অধ্যাপক লাস্কি

এজন্যই নাগরিকদের আন্তর্জাতিকভাবে চিন্তা ভাবনার উপরে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। একজন

সুনাগরিককে শুধু দেশ ও জাতির কল্যাণের কথা ভাবলেই চলবে না। তাঁকে বিশ্বমানবতার মুক্তি ও

শান্তির জন্যে কাজ করতে হবে। একথা সত্য সভ্যতার ক্রমবিকাশে এবং মানব জাতির উন্নতি ও

অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিশ্বনাগরিকতার চেতনাবোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে পারে। এ সুমহান

আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশ্বের মানুষ জাতিসংঘের বিশ্বজনীন আদর্শের প্রতি ঐক্যমত ও আনুগত্য প্রকাশ

করছে।

সারকথা:

প্রজ্ঞা-দীপ্ত, বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন সচ্চরিত্রবাণ নাগরিকই হল সুনাগরিক। একটি দেশ ও জাতির

উন্নতি ও অগ্রগতিতে সুনাগরিক গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে থাকে। নাগরিকতার ধারণা আজ

সীমিত গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা একদিকে একটি রাষ্ট্রের সদস্য অন্যদিকে আবার বিশ্ব
নাগিরিক। সুনাগরিককে অবশ্যই বিশ্ব শান্তি ও কল্যানের জন্য কাজ করতে হবে।
আমরা একদিকে
একটি রাষ্ট্রের
নাগরিক অন্যদিকে
বিশ্বনাগরিক।


সঠিক উত্তরটি লিখুন

১। সুনাগরিকের গুণাবলী সম্পর্কে আলোচনা করেছেন−

ক. ই. এম. হোয়াইট

খ. গার্নার

গ. লাস্কি

ঘ. গেটেল।

২। বুদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযম সুনাগরিকের এ তিনটি গুণের কথা বলেছেন কে ?

ক. লর্ড-ক্লাইভ

খ. লর্ড-কার্জন

গ. লর্ড-ব্রাইস

ঘ. লর্জ-বার্নাডশ।

৩। শূন্যস্থান পূরণ করুন

ক. অধ্যাপক ই. এম. হোয়াইটের মতে সুনাগরিকের গুণাবলী হলো− জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ----।

খ. ------------ তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেন।

গ. বিবেকবান মানুষ হচ্ছেন -----------।

ঘ. বর্তমান বিশ্বে কোন নাগরিক বা রাষ্ট্র ------ বসবাস করতে পারে না।

সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন:

১। সুনাগরিকের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করুন।

২। বিশ্বনাগরিকতা কি? ব্যাখ্যা করুন।

রচনামূলক প্রশ্নঃ

১। সুনাগরিকের গুণাবলী সম্পর্কে আলোচনা করুন।

২। লর্ড ব্রাইস সুনাগরিকের যেসকল গুণাবলীর কথা বলেছেন তা বর্ণনা করুন।

উত্তরমালা: ১. ক, ২. গ, ৩. ক-নিষ্ঠা, খ-সুনাগরিক, গ-আদর্শ, ঘ-বিচ্ছিন্নভাবে।